পারফর্মারদের জীবন বড়ই নিষ্ঠুর। আজ তুমি যাঁদের কাঁধে বিচরণ করছ, মুহূর্তের ভগ্নাংশের ব্যর্থতায় তোমাকে কাঁধ থেকে ফেলে দিয়ে যাবে ব্যর্থতার গভীর সাগরে।
বয়সের সংখ্যা যেরকম শুধুই একটা সংখ্যা। আবার সেই সংখ্যাটাই কোনও কোনও ক্ষেত্রে শুধুই আর সংখ্যা থাকে না। পরফরম্যান্সের উত্তুঙ্গ শিখরে বিচরণ করতে গেলে শরীর বিজ্ঞানের ভূমিকাটাও অতিপ্রয়োজনীয়। সেখানেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে (Ronaldo) দেখে মনে হচ্ছে, সত্যিই বয়স বড়ই নিষ্ঠুর। কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে সিআর সেভেন যেন ফুটবল বিষণ্ণতার এক মহাদলিল। যেখানে সগর্বে মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়ার মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। সেখানে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো!
কলম্বিয়া ছাড়ুন। কঙ্গোর সামনে পড়তেই পর্তুগাল আর রোনাল্ডোর সাম্প্রতিক অবস্থার যে রূঢ় বাস্তব দেখা গিয়েছিল, কলম্বিয়ার সামনে সেটাই যেন ফিরে ফিরে এল। আর্জেন্টাইন কোচ নেস্টর লরেঞ্জের ওরকম ট্যাকটিক্যাল মুভের সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কি-ই বা করতে পারতেন তিনি?
এমনিতেই শনিবার হার্ডরক স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে পর্তুগালের তুলনায় কলম্বিয়ার সমর্থকদের হলুদ রঙের সমাহার বেশি। সেখানে ম্যাচের পর সেই হলুদ গ্যালারি থেকে রোনাল্ডোর উদ্দেশ্যে টিকা-টিপ্পনীগুলি শুনলেন? না শুনলে ভিডিও ক্লিপিংসগুলি দেখুন, কলম্বিয়ার সমর্থকরা টিপন্নী কেটে বলছেন, ‘‘রোনাল্ডো কোথায়? রোনাল্ডো কোথায়?’’ ৯০ মিনিট ধরে কলম্বিয়ার গোল লক্ষ্য করে মাত্র একটি শট ! উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে যখন মুহূর্তের সুযোগে হাফ টার্নে বল জালে ফেলে দিয়েছিলেন, সেই রোনাল্ডোই ক্লান্ত, অবসন্ন অধিনায়ক হিসেবে বারবার কলম্বিয়ার কঠিন প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে ফিরলেন।
ম্যাচ শেষে তাঁর উদ্দেশ্যে গ্যালারি থেকে উড়ে আসা বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক টিকা-টিপ্পনী শুনতে শুনতে তাঁরও কি মনে হয়নি, কিছু এটা বলা দরকার? গ্রুপে রানার্স হওয়া মানেই তো সব শেষ নয়। এখনও তো যুদ্ধ বাকি। নকআউট রয়েছে। ক্রোয়েশিয়াকে হারাতে পারলে এই গ্যালারিই আবার তাঁর গঠিত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। ম্যাচ শেষে আর দেরি করেননি। সোশাল মিডিয়ায় বার্তা দিয়েছেন, ‘গ্রুপ পর্ব শেষ হয়েছে। নকআউট পর্যায়ে শুরু হবে আসল লড়াই। এই কঠিন লড়াইয়ে শক্তিশালী দলগুলির মুখে পড়লেও ড্রেসিংরুম মানসিকভাবে শক্ত রয়েছে।’
তাতেও কি তাঁর প্রতি ধেয়ে আসা সমালোচনার তিরগুলি বিষমুক্ত হবে? আমেরিকা বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) তাঁর প্রতি বিশ্বফুটবল সমর্থকদের ভালোবাসার ওঠানামা অনেকটা শেয়ার বাজারের মতো। সমর্থনের সেনসেক্স এই ঊর্ধ্বমুখী তো পরক্ষণেই আবার সেটা নিম্নমুখী! রোনাল্ডোর প্রতি এই ধেয়ে আসা সমালোচনায় মাখানো বিষাক্ত তিরগুলির সামনে ঢালের মতো দাঁড়িয়েছেন একদা তাঁর সহযোদ্ধা, ডিফেন্ডার ব্রুনো আলভেস। অধিনায়কের প্রতি এখনও পূর্ণ ভরসার সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, “যে কোনও অবস্থায় তোমার উপর আমাদের ভরসা আছে ক্রিশ্চিয়ানো। পর্তুগাল ড্রেসিংরুমের উচিত, তাদের অধিনায়কের সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। সামনে ক্রোয়েশিয়া থাকলেও, তাতে কিছু এসে যায় না।”
কোচ রবার্তো মার্টিনেস অবশ্য এখনও রোনাল্ডোর সামনে বুক আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। চেষ্টা করছেন, তাঁর দলের সেরা অস্ত্রটা যদি শেষবারের মতো মিসাইলের গতিতে প্রতিপক্ষর বক্সে আছড়ে পড়তে পারে। হয়তো সেই কারণেই কলম্বিয়া ম্যাচের পর পর্তুগাল কোচ বলছিলেন, ‘‘যেভাবে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডাররা রোনাল্ডোর সামনে একাধিক ডিফেন্ডার দিয়ে দেওয়াল তুলছিল, রোনাল্ডোর জন্য জায়গা পাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাছাড়া ওর কৃতিত্ব শুধু গোলের মধ্যেই খুঁজলে হবে না। দলে রোনাল্ডোর উপস্থিতিও আমাদের জন্য বড় ফ্যাক্টর।’
