বিশ্বকাপে গোল করার পর কাঁদছেন মেক্সিকোর রাউল গিমেনেজ। বাবাকে গোল উৎসর্গ করছেন তিনি। কিংবা বিশ্বকাপ জয়ের পর বাবাকে গোলপোস্টের নিচে দাঁড় করিয়ে পেনাল্টি মারছেন স্পেনের পেদ্রি। বাবার গোলকিপার হওয়ার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ হোক এভাবেই। এই ঘটনাগুলো নিয়ে চর্চা হয়। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে 'লাভ' রিঅ্যাক্ট বাড়ে। এর মাঝখানে ক'জন জানতে পারে রোহিত দাসের কথা? রোহিত কলকাতা লিগের (CFL 2026) প্রথম ডিভিশনের ক্লাব সাদার্ন সমিতিতে খেলেন। ২০ বছর বয়সি ফুটবলারের বাবা প্রয়াত হয়েছেন কিছুদিন আগে। রোহিতের বাবাও স্বপ্ন দেখতেন ফুটবলার হওয়ার। সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। প্রয়াত বাবার সেই স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব রোহিতের কাঁধে। তাই কাছা পরেই অনুশীলনে হাজির।
মাত্র ৫৬ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন রোহিতের বাবা। সুস্থসবল মানুষটি মে মাসে আচমকাই অসুস্থ হন। একাধিকবার অস্ত্রোপচার হয়। কিন্তু রোহিতের বক্তব্য, 'ভুল চিকিৎসা'র শিকার হয়েই বাবার মৃত্যু ঘনিয়ে এল। বেসরকারি হাসপাতালে ৩৮ লক্ষ টাকা বিল হয়েছিল। পরিবারের লোকেদের রীতিমতো হাত পাততে হয়েছিল। এখনও লক্ষ লক্ষ টাকার দেনা রয়েছে বেলেঘাটার সদ্য তরুণের মাথায়। গত এক-দেড়মাস কত বিনিদ্র রাত কেটেছে। বাবার ছিল ছোট ব্যবসা। দুশ্চিন্তা, যন্ত্রণা, কষ্ট সামলেও অনুশীলন চালিয়ে গিয়েছে রোহিত। অবশেষে ১০ জুলাই সকালে প্রয়াত হন তাঁর বাবা।
ছবি: সংগৃহীত
বুধবার ছিল শ্রাদ্ধ। কিন্তু এদিনও অনুশীলন ছাড়েনি রোহিত। সাদা কাছা পরে অনুশীলনে আসেন সাদার্নের ডিফেন্ডার। কীভাবে এই তাগিদ পেল? রোহিত শোনালেন তাঁর মায়ের বলা কয়েকটি কথা। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালকে ফোনে রোহিত বলছিলেন, "বাবার মৃত্যুর পরদিন সকালে দেখি, মা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মা তখন আমাকে বলে, আর যাই করিস। ফুটবলটা ছাড়িস না। বাবার স্বপ্নপূরণ করিস। এই কথাটা শোনার পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। তখনই ঠিক করি, যাই হোক না কেন, অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে।"
বাবার সঙ্গে রোহিত। ছবি: সোশাল মিডিয়া
লক্ষ্য ঠিক করে ফেলেছেন রোহিত। গতবছর ডায়মন্ড হারবারের হয়ে আরএফডিএলে খেলেছেন। এবার সাদার্ন সমিতিতে। রোহিত বলছিলেন, "বাবার স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। দারিদ্রতার কারণে সেটা পূর্ণ হয়নি। বাবার ইচ্ছা ছিল,তাঁর অসম্পূর্ণ স্বপ্নটা আমি পূরণ করি। তাই অসুস্থতার সময়ও অনুশীলন ছাড়িনি। আমাকে এরপর ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের মধ্যে কোনও এক প্রধানে খেলতে হবে। এরপর আমি দেশের হয়ে খেলতে চাই।" সেই স্বপ্নপূরণ হবে কি না, সেটা তো সময় বলবে। কিন্তু বাবার অপূর্ণ স্বপ্নপূরণের জন্য লড়ে যাওয়ার গল্প লিখে চলেছেন স্টপার রোহিত। গতবছর পাঠচক্রের গোলকিপার অর্ণব দাস মায়ের প্রয়াণের পর মাঠে নেমেছিলেন। এবার তৈরি রোহিত। 'স্টপার' উপন্যাসে মতি নন্দী লিখেছিলেন, "আমরা সবাই তো স্টপার ঘোষদা, কেউ মাঠের মধ্যে, কেউ মাঠের বাইরে। ঠেকাচ্ছি আর ঠেকাচ্ছি।" অর্ণব-রোহিতরা সেই গল্প লিখে চলেছেন।
