ভারতের সঙ্গীতাকাশে নক্ষত্র পতন। অবসান একটি যুগের। নেই আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle)। ৯২ বছর বয়সে নিভল জীবনদীপ। অসুস্থ হয়ে ভর্তি ছিলেন মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হসপিটালে। চিকিৎসকদের কথায়, বুকে সংক্রমণই তাঁর শারীরিক অবস্থাকে দ্রুত জটিল করে। তাঁর মৃত্যু শুধু এক কিংবদন্তির বিদায় নয়, বরং আমাদের সামনে আনল এক স্বাস্থ্য-সতর্কবার্তাও, বয়স বাড়লে বুকে সংক্রমণ কতটা মারাত্মক হতে পারে।
এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, বয়স বাড়লে শরীরের ছোট সমস্যা আর ততটা ছোট থাকে না। বিশেষ করে বুকে সংক্রমণ অনেক সময় নিঃশব্দে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
থামল সুরেলা সফর। ছবি: সংগৃহীত
বুকে সংক্রমণ: সাধারণ অসুখ, কিন্তু বড় ঝুঁকি
বুকে সংক্রমণ মূলত ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে হয়, যা সাধারণ সর্দি বা ফ্লু-র পরেও দেখা দিতে পারে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের কারণে শ্বাসনালিতে প্রদাহ দেখা দেয় এবং ফুসফুসে জমে শ্লেষ্মা বা কফ।
৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গুরুতর হয়, কারণ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অনেকেরই থাকে ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা বা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)-এর মতো অসুখ, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বয়স বাড়লে ছোট সমস্যাকেও অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
কোন লক্ষণগুলো দেখলে সাবধান হবেন?
তরুণদের তুলনায় বয়স্কদের ক্ষেত্রে লক্ষণ অনেক সময় ভিন্ন হতে পারে। তাই এগুলো চিনে রাখা খুব জরুরি-
হঠাৎ বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ: ফুসফুসের সসম্যায় অক্সিজেন কমে গেলে মস্তিষ্কে প্রভাব পড়ে, ফলে আচরণে তার লক্ষণ প্রতিফলিত হয়।
একটানা কাশি: বিশেষ করে হলুদ, সবুজ বা রক্ত মেশানো কফ বের হলে তা গুরুতর সংক্রমণের ইঙ্গিত।
শ্বাসকষ্ট: অল্প কাজেই হাঁপিয়ে যাওয়া বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া ফুসফুসে সমস্যা বাড়ার লক্ষণ।
বুকে ব্যথা: গভীর শ্বাস বা কাশির সময় ব্যথা বাড়লে তা নিউমোনিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
অতিরিক্ত দুর্বলতা: হাঁটাচলা করতে কষ্ট হওয়া বা হঠাৎ পড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিলে।
জ্বর না-ও থাকতে পারে: অনেক সময় বয়স্কদের তেমন জ্বর না থাকলেও, ঠান্ডা লাগা বা শীত শীত ভাব থাকতে পারে।
খিদে কমে যাওয়া ও জলশূন্যতা: খাওয়া কমে গেলে শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
জরুরি টিকাকরণ। ছবি: সংগৃহীত
কী কারণে সংক্রমণ ফুসফুসে বাসা বাঁধে?
বয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে-
আগে থেকে ফুসফুসের অসুখ: সিওপিডি বা টিবির মতো অসুখ ফুসফুসকে দুর্বল করে।
হার্টের সমস্যা: ফুসফুসে জল জমে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
অল্প চলাফেরা: দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকলে ফুসফুস ঠিকমতো কাজ করে না।
অপুষ্টি: যা কমিয়ে দেয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
ডায়াবেটিস বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসুখ: এতে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই দুর্বল হয়ে পড়ে।
অ্যাসপিরেশন: খাবার বা লালা ভুল পথে ফুসফুসে ঢুকে গেলে সংক্রমণ শুরু হতে পারে, যাকে বলা হয় অ্যাসপিরেশন।
ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে ব্রিদিং এক্সারসাইজ। ছবি: সংগৃহীত
প্রতিরোধ: ছোট অভ্যেস, বড় সুরক্ষা
বুকে সংক্রমণ পুরোপুরি এড়ানো না গেলেও, কিছু অভ্যেস ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে-
- প্রতি বছর ফ্লু এবং নিউমোনিয়ার টিকা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
- হাত পরিষ্কার রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
- ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং দূষিত পরিবেশে কম থাকা
- পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত জলপান
- প্রতিদিন হাঁটা বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ফুসফুসকে সক্রিয় রাখে
- ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ বা সিওপিডি থাকলে, তা নিয়ন্ত্রণে রাখা
- অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার করা
- যে কোনও শারীরিক সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সতর্ক থাকলে এবং লক্ষণগুলো দ্রুত বুঝতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব। বুকে সংক্রমণ অনেক সময় নীরবে শুরু হয়, কিন্তু দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা এবং নিয়মিত যত্ন- এই তিনই হতে পারে জীবন বাঁচানোর চাবিকাঠি।
