সন্তানের জন্মের পর মাত্র একটি ছোট্ট ইনজেকশন। সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। আর সেটিই বাঁচাতে পারে একটি শিশুর জীবন। চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, ভিটামিন কে (K) ইনজেকশন (Vitamin K Injection) না পেলে জন্মের কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই ভয়াবহ রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হতে পারে নবজাতক। এমনকী মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
সম্প্রতি আমেরিকায় একের পর এক শিশুর গুরুতর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে চিকিৎসক মহলে। কারও খিঁচুনি, কেউ হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়েছে, আবার কেউ শ্বাস নিতে না পেরে মারা গিয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, জন্মের পর তাদের কাউকেই দেওয়া হয়নি নিয়মিত ভিটামিন কে ইনজেকশন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ভিটামিন কে ডেফিসিয়েন্সি ব্লিডিং (ভি.কে.ডি.বি)। এটি এমন এক প্রাণঘাতী সমস্যা, যেখানে শিশুর শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি হয় না। ফলে শরীরের ভেতরে শুরু হতে পারে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ।
জরুরি ভিটামিন কে ইনজেকশন। ছবি: প্রতীকী
কেন এত জরুরি এই ইনজেকশন?
জন্মের সময় প্রায় সব শিশুর শরীরেই ভিটামিন কে-এর পরিমাণ খুব কম থাকে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীর থেকে এই ভিটামিন খুব সামান্যই শিশুর শরীরে পৌঁছায়। এমনকী বুকের দুধেও এর পরিমাণ খুব কম। এই কারণেই নবজাতকের শরীর নিজের মতো করে দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন কে শরীরে এমন কিছু ক্লটিং ফ্যাক্টর তৈরি করতে সাহায্য করে, যা রক্ত জমাট বাঁধার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই ইনজেকশন না পেলে মস্তিষ্ক, অন্ত্র, পাকস্থলী বা শরীরের অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হতে পারে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হল, অনেক সময় কোনও আগাম লক্ষণই দেখা যায় না। হঠাৎ খিঁচুনি, রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে রক্ত, অতিরিক্ত ঘুম, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
এক ইনজেকশনেই কমবে ঝুঁকি। ছবি: প্রতীকী
ভারতে এই ঝুঁকি কতটা?
ভারতে অধিকাংশ হাসপাতালেই জন্মের পর ভিটামিন কে ইনজেকশন (Vitamin K Injection) দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সব নবজাতককেই এই সুরক্ষামূলক ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।
সাধারণত জন্মের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই ইনজেকশন দেওয়া হয়। ১ কেজির বেশি ওজনের শিশুদের ১ মিলিগ্রাম এবং কম ওজনের শিশুদের ০.৫ মিলিগ্রাম ডোজ দেওয়া হয়।
তবে চিকিৎসকদের দাবি, এখনও বহু শিশু এই সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। কারণ হিসেবে উঠে আসছে বাড়িতে সন্তান জন্মানো, স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব এবং সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য।
কিছু অভিভাবক ভুল করে এই ইনজেকশনকে ভ্যাকসিন মনে করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি শিশুর জন্য ক্ষতিকর। যদিও চিকিৎসকদের বক্তব্য, এই ইনজেকশন বহু দশক ধরে নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণিত।
মিস যেন না হয়। ছবি: প্রতীকী
কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে ভিটামিন কে ডেফিসিয়েন্সি ব্লিডিং?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব শিশু ভিটামিন কে ইনজেকশন পায় না, তাদের মধ্যে ভি.কে.ডি.বি-র ঝুঁকি প্রায় ৮১ গুণ বেশি। এই রোগ তিন ধাপে দেখা দিতে পারে।
প্রথম ধাপ জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। দ্বিতীয় ধাপ জন্মের ২ থেকে ৭ দিনের মধ্যে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হল দেরি করে দেখা দেওয়া ভি.কে.ডি.বি, যা জন্মের দু'সপ্তাহ থেকে ছ'মাসের মধ্যে দেখা দিতে পারে।
এই পর্যায়ে প্রায় ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ শিশুর মস্তিষ্কের ভেতর রক্তক্ষরণ হতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, পক্ষাঘাত বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, অভিভাবকদের সোশাল মিডিয়ার গুজবে নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর ভরসা রাখা উচিত। কারণ জন্মের পর দেওয়া এই একটি ছোট্ট ইনজেকশনই সন্তানকে প্রাণঘাতী বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে।
