সন্তান জন্ম মানেই নতুন আনন্দ, নতুন দায়িত্ব। কিন্তু এই সুখের আড়ালেই নীরবে বাড়তে পারে এক গভীর মানসিক চাপ, বিশেষ করে বাবাদের ক্ষেত্রে। আমরা সাধারণত পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনকে মায়েদের সমস্যাই বলে মনে করি। কিন্তু নতুন এক বড় গবেষণা বলছে, বাবারাও এই মানসিক সমস্যার শিকার হন এবং তাঁদের ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় দেরিতে, প্রায় এক বছর পর গিয়ে প্রকট হয়।
গবেষণায় ১০ লক্ষেরও বেশি সুইডিশ বাবার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, সন্তানের জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস বাবারা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকেন। অনেকেই সেই সময়ে মানসিকভাবে বেশ ইতিবাচকও অনুভব করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে জীবনের নতুন চাপ, দায়িত্ব এবং পরিবর্তন তাঁদের মনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, যার ফল এক বছর পর গিয়ে বড় আকারে সামনে আসে।
এটি কোনও সাময়িক মনখারাপ নয়। ছবি: সংগৃহীত
দেরিতে আঘাত হানে অবসাদ
গবেষণায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বাবাদের মধ্যে ডিপ্রেশন ও স্ট্রেসজনিত সমস্যা সন্তানের এক বছর বয়সে পৌঁছানোর সময় ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। অর্থাৎ, সমস্যাটা হঠাৎ করে নয়, বরং সময়ের সঙ্গে জমে ওঠা মানসিক চাপের ফল। প্রথম দিকে যা বোঝা যায় না, পরে সেটাই বড় আকার ধারণ করে।
কেন চাপ জমতে থাকে?
সন্তান জন্মের পর বাবাদের জীবনে একাধিক পরিবর্তন আসে। রাতে ঘুম কমে, অফিসের চাপ সামলানো, পরিবারের দায়িত্ব বেড়ে যাওয়া, আর্থিক চিন্তা- সব মিলিয়ে মানসিক ক্লান্তি বাড়তে থাকে। প্রথমদিকে এগুলো সামাল দেওয়া গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা মনকে দুর্বল করে। সম্পর্কের পরিবর্তন, নিজের সময়ের অভাব- এসবও ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে।
কেন চুপ থাকেন অনেক বাবা?
গবেষকরা মনে করছেন, অনেক পুরুষই এই সময় নিজের মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না। তাঁদের কাছে মনে হয়, এই সময়ে মায়ের যত্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নিজের কষ্ট চাপা দিয়ে রাখেন। এই অভ্যেসের কারণে অনেক সময় চিকিৎসা নিতে দেরি হয়, আর ততদিনে সমস্যা হয় আরও গভীর।
প্রতি ১০ জন বাবার মধ্যে একজন এই সমস্যায় ভোগেন। ছবি: সংগৃহীত
পুরুষদের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কী?
পুরুষদের এই প্যাটার্নাল পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন (PPND) কোনও সাময়িক মনখারাপ নয়, বরং একটি গুরুতর মানসিক অবস্থা। গবেষণা বলছে, প্রায় প্রতি ১০ জন বাবার মধ্যে একজন এই সমস্যায় ভোগেন। এটি সন্তানের জন্মের কয়েক মাস পর শুরু হতে পারে, আবার এক বছরের মধ্যেও যেকোনও সময় দেখা দিতে পারে।
ঝুঁকির পেছনে যেসব কারণ
এই সমস্যার পিছনে একাধিক কারণ কাজ করে-
- হরমোনের পরিবর্তন, যেমন টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া
- সঙ্গীর পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন থাকলে ঝুঁকি বাড়ে
- দীর্ঘদিন ঘুমের অভাব
- আর্থিক চাপ ও পরিবারের দায়িত্ব
- আগের ডিপ্রেশন বা উদ্বেগ
লক্ষণগুলো একটু আলাদা
পুরুষদের ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনের লক্ষণ অনেক সময় আলাদা ভাবে প্রকাশ পায়। যেমন-
- অকারণে রাগ বা বিরক্তি
- পরিবার বা বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া
- হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ
- মাথাব্যথা, পেটের সমস্যা বা শরীরে ব্যথা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি ও মানসিক চাপ
শুধু মায়ের নয়, বাবার মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ছবি: সংগৃহীত
কেন এখনই সচেতন হওয়া দরকার?
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাবাদের মানসিক স্বাস্থ্য এখনও অনেকটাই অবহেলিত। সাধারণত সন্তান জন্মের কয়েক মাস পরেই পরিবারের নজর কমে যায়। কিন্তু বাস্তবে সেই সময়ের পরেই ঝুঁকি বাড়তে থাকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা ধরা পড়ে দেরিতে, যখন তা গুরুতর হয়ে ওঠে।
কী করণীয়?
পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মানসিক সুস্থতা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে নতুন বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে। তাই শুধু মায়ের নয়, বাবার মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন চোখে পড়লে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়তে হলে, বাবা-মা দুজনেরই মানসিকভাবে সুস্থ থাকা প্রয়োজন। তাই এই নীরব সমস্যাকে সময়মতো চিনে নেওয়াই হতে পারে একটি সুখী পরিবারের চাবিকাঠি।
