৬০ বছর বয়সে থামল জীবনযুদ্ধ। প্রয়াত অভিনেত্রী প্রবীণা দেশপাণ্ডে (Pravina Deshpande Died)। শেষ অভিনয় ইমরান হাশমির সঙ্গে ‘তস্করী’ সিরিজে। তার আগে 'রেডি' ছবিতে সলমন খানের মায়ের ভূমিকাতেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ২০১৯ সাল থেকে লড়ছিলেন ব্লাড ক্য়ানসারের সঙ্গে। চিকিৎসার পরিভাষায় যা পরিচিত মাল্টিপল মায়েলোমা নামে। অসুস্থতা সত্ত্বেও অভিনয়ে ছিল না কোনও খামতি। রোগ ধীরে ধীরে শরীরকে ভাঙলেও মনের জোর ছিল অটুট।
রোগ নির্ণয়ের আগেই শরীর দিচ্ছিল সংকেত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রথমে ত্বকে ছোট ছোট ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শুরুতে তিনি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে শরীরে। তাঁর কথায়, প্রথমে ত্বকে সামান্য় সমস্য়া হয়েছিল, তারপর ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। ২০২২ সালে প্রথম দফার চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর আচমকাই তীব্র পিঠের ব্যথা শুরু হয়। তখনও নিয়মিত করে চলেছেন অভিনয়। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, একটি নাটকে অভিনয়ের সময়ই পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করেন। তখনই বুঝতে পারেন, আবার চিকিৎসা শুরু করার সময় এসেছে। সেপ্টেম্বরে একটি ওয়েব সিরিজের শুটিং শেষে ওই মাসেই ভর্তি হন কেমোথেরাপির জন্য। এরপর করা হয় বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। অসুস্থতার মাঝেও কাজের প্রতি ছিল তাঁর দায়বদ্ধতা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শরীরের সঙ্গে লড়াইটা হয়ে পড়ে কঠিন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক এই মাল্টিপল মায়েলোমা আসলে কী? কতটা ভয়ংকর এই অসুখ?
মাল্টিপল মায়েলোমা আসলে কী?
এটি অস্থিমজ্জার প্লাজমা কোষের ক্যানসার। প্লাজমা কোষ আমাদের শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। কিন্তু যখন এই কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন স্বাভাবিক রক্তকণিকার উৎপাদন কমে যায়। ফলে রক্তাল্পতা, সংক্রমণ, কিডনির সমস্যা এবং সবচেয়ে বেশি হাড়ের ক্ষয় দেখা দেয়। অনেক সময় রোগী বুঝতেই পারেন না, কারণ উপসর্গগুলো প্রথমে খুব সাধারণ মনে হয়।
কোন লক্ষণগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়?
- দীর্ঘদিনের পিঠ বা হাড়ের ব্যথা
- কোনও পরিশ্রম ছাড়াই অকারণে অতিরিক্ত ক্লান্তি
- ঘন ঘন সংক্রমণ
- হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়া
- ত্বকে ফুসকুড়ি বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন
- কিডনির সমস্যা বা প্রস্রাবে জটিলতা
- পিঠে তীব্র ব্যথা অনেক সময় বড় সতর্কবার্তা হতে পারে, বিশেষ করে ব্য়থা দীর্ঘস্থায়ী হলে
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
- নারীদের তুলনায় পুরুষদের এই ক্য়ানসারের ঝুঁকি বেশি।
- গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের হার অন্যদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জেনেটিক ও সামাজিক স্বাস্থ্য বৈষম্য- দুই কারণই এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।
- মাল্টিপল মায়েলোমা সাধারণত মধ্যবয়সের পর বেশি ধরা পড়ে। বেশিরভাগ রোগীর বয়স ৪০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। রোগ নির্ণয়ের গড় বয়স মোটামুটি ৬৯ বছর। সামগ্রিকভাবে এটি প্রবীণদের রোগ বলেই ধরা হয়।
- পরিবারে ব্লাড ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে
- স্থূলতা
- কিছু রাসায়নিকের সঙ্গে দীর্ঘদিন সংস্পর্শে থাকা
চিকিৎসায় কতটা সাড়া মেলে?
মাল্টিপল মায়েলোমা পুরোপুরি সারানো এখনও কঠিন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির হাত ধরে এখন এসেছে কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি এবং বোনম্যারো বা স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের মতো অত্য়াধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং রোগী দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
কেন সচেতনতা জরুরি
এর লক্ষণগুলো সাধারণ সমস্যা ভেবে অনেকেই এড়িয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘদিনের হাড়ের ব্যথা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা বারবার সংক্রমণ হলে রক্ত পরীক্ষা করা জরুরি। সময়মতো ধরা পড়লে চিকিৎসা অনেক বেশি কার্যকর হয়। প্রবীণা দেশপাণ্ডের লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শরীরের ছোট ছোট সংকেতকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
