বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের পাশাপাশি মন আর স্মৃতিশক্তিতেও পরিবর্তন আসে। এই সময় যত্ন বলতে আমরা সাধারণত ওষুধ, ফিজিওথেরাপি বা নিয়মিত হেলথ চেকআপের কথাই ভাবি। কিন্তু যদি এমন কিছু থাকে, যা একই সঙ্গে আনন্দ দেয়, শরীর সচল রাখে আর মন ভালো রাখে? ঠিক সেখানেই সামনে আসছে 'ট্যাঙ্গো থেরাপি'।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আর্জেন্টাইন ট্যাঙ্গোর উপর ভিত্তি করে তৈরি এই বিশেষ থেরাপি প্রবীণদের জীবনের মান, চলাফেরার ক্ষমতা এবং মানসিক সুস্থতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের স্মৃতিভ্রংশ বা কগনিটিভ সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব বেশ ইতিবাচক।
ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে কার্যকর? ছবি: সংগৃহীত
ট্যাঙ্গো থেরাপি কী?
ট্যাঙ্গো থেরাপি আসলে এক ধরনের ডান্স মুভমেন্ট থেরাপি, যেখানে ট্যাঙ্গোর তাল, স্টেপ, শরীরের ভারসাম্য আর সঙ্গীর সঙ্গে সমন্বয়- এই সবকিছুকে ব্যবহার করা হয় চিকিৎসার অংশ হিসেবে। এটি শুধু শরীরচর্চা নয়, এর মধ্যে থাকে গান, স্মৃতি, আবেগ আর সামাজিক যোগাযোগের মিশেল।
গবেষণায় কী জানা গেল?
গবেষণায় অংশ নেন গড়ে ৮৫ বছর বয়সি ৫৪ জন প্রবীণ ব্যক্তি, যাঁদের অনেকেরই কগনিটিভ সমস্যা ছিল। নির্দিষ্ট সময় ধরে তাঁরা ট্যাঙ্গো থেরাপি সেশনে অংশ নেন। তারপর তাঁদের জীবনের মান, শারীরিক সক্ষমতা, হাঁটার দক্ষতা, স্বনির্ভরতা এবং মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন করা হয়। আর তার ফলাফল ছিল বেশ আশাব্যাঞ্জক।
এর উপকার কী?
জীবনযাপনের মান উন্নয়ণ
অংশগ্রহণকারীদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানে উন্নতি দেখা যায়। একাকীত্ব, মনখারাপ বা নির্ভরশীলতা- এসব কিছু কিছুটা হলেও কমে।
অংশগ্রহণে আগ্রহ
প্রায় ৯২% উপস্থিতি দেখাচ্ছে প্রবীণরা শুধু অংশ নিয়েছেন তা নয়, তাঁরা এটি উপভোগও করেছেন। সেশন শেষে তাঁদের মানসিক সুস্থতার স্কোর ছিল বেশ ভালো।
শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি
ভারসাম্য, সমন্বয় এবং হাঁটার ধরনে উন্নতি হয়েছে, যা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
ট্যাঙ্গো থেরাপি শুধু নাচ নয়। ছবি: সমগৃহীত
কেন ট্যাঙ্গো এত কার্যকর?
ট্যাঙ্গো শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্ককেও একসঙ্গে কাজ করায়।
মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বাড়ায়: স্টেপ মনে রাখা ও তাল মিলিয়ে চলা স্মৃতি ও মনোযোগ বাড়ায়।
একাকীত্ব কমায়: সঙ্গীর সঙ্গে নাচ সামাজিক সংযোগ তৈরি করে।
মন ভালো রাখে: গান ও নাচের তাল মানসিক চাপ কমায়।
ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনা
ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ শুধু মনে নয়, শরীরেও প্রভাব ফেলে। প্রচলিত চিকিৎসায় যেখানে ওষুধের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়, সেখানে ট্যাঙ্গো থেরাপি এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। এমনকী মাঝারি পর্যায়ের কগনিটিভ সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরাও এতে অংশ নিয়ে উপকৃত হয়েছেন।
ভবিষ্যতের দিশা
যদিও আরও বড় গবেষণা দরকার, তবুও এখনই বোঝা যাচ্ছে, এই ধরনের সৃজনশীল থেরাপি ভবিষ্যতে প্রবীণদের যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে যখন বিশ্বজুড়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তখন এমন সহজ, আনন্দদায়ক পদ্ধতি অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ট্যাঙ্গো থেরাপি আসলে শুধু নাচ নয়। এটি শরীর, মন আর সম্পর্ক- সবকিছুর এক সুন্দর মেলবন্ধন। অনেক সময় ছোট ছোট আনন্দই জীবনের বড় পরিবর্তন এনে দেয়, আর ট্যাঙ্গোর ছন্দে সেই সম্ভাবনাই নতুন করে তৈরি হচ্ছে।
