একসময় উচ্চ রক্তচাপকে শুধুই প্রবীণদের অসুখ বলেই মনে করা হত। কিন্তু এখন চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে এক নতুন প্রবণতা— স্কুল ও কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যেই দ্রুত বাড়ছে হাই ব্লাড প্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ আজকের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা, দীর্ঘ মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং ঘুমের অভাব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে, যেখানে সাফল্য যেন প্রতিদিনের পরীক্ষার নাম। ভালো নম্বর, র্যাঙ্ক, জয়েন্ট-নিটের প্রস্তুতি, কোচিং, পারফরম্যান্স— সবকিছুর চাপে অনেকের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্রাম, খেলাধুলা এবং মানসিক স্বস্তি। আর সেই অদৃশ্য চাপ ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলছে শরীরের উপর, বিশেষ করে হৃদ্স্বাস্থ্যে।
বহু পড়ুয়া সাফল্যের লক্ষ্যে এমন জীবনযাপনে ঢুকে পড়ছে, যেখানে পর্যাপ্ত ঘুম নেই, মানসিক চাপ অত্যন্ত বেশি এবং শরীরের যত্ন নেওয়ার সময়ও প্রায় থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস চলতে থাকলে তা ভবিষ্যতে গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
বাড়ছে রক্তচাপ? ছবি: সংগৃহীত
মানসিক চাপের প্রভাব শরীরের অভ্যন্তরেও
দীর্ঘসময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোন দীর্ঘদিন বেশি থাকলে রক্তনালীর উপর বাড়তি চাপ পড়ে, হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যায় এবং ধীরে ধীরে রক্তচাপও বাড়তে শুরু করে।
তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে রাত জেগে পড়ার অভ্যাস, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, শরীরচর্চার অভাব এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জীবনযাপন শরীরের মেটাবলিজমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং খুব অল্প বয়সেই ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল বা স্থূলতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কম ঘুমেই বাড়ে বিপদ
চিকিৎসকদের মতে, কিশোরদের প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে বহু পড়ুয়ার গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা, মোবাইল স্ক্রিন বা কোচিংয়ের কারণে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। এই দীর্ঘদিনের অনিদ্রা শুধু ক্লান্তিই বাড়াচ্ছে না, শরীরের ভেতরে নীরব বিপদও তৈরি করছে।
চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের অভাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বৃদ্ধি, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। ফলে বাইরে থেকে সুস্থ দেখালেও ভেতরে ভেতরে শরীরে বিপজ্জনক পরিবর্তন শুরু হতে পারে।
একসময় ভাবা হত প্রবীণদের অসুখ, এখন কিশোররাও আক্রান্ত! ছবি: সংগৃহীত
কফি, এনার্জি ড্রিংক আর জাঙ্ক ফুডও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
পরীক্ষার সময়ে জেগে থাকার জন্য অনেক পড়ুয়ারই ভরসা অতিরিক্ত কফি, এনার্জি ড্রিংক, চকোলেট, প্রসেসড ফুড ও চিনিযুক্ত খাবার। এগুলো সাময়িকভাবে ক্লান্তি কমালেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ক্ষতি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা।
অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও চিনি শরীরে রক্তচাপ বাড়াতে পারে, ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং উদ্বেগও বাড়িয়ে দিতে পারে। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস থেকেই তৈরি হতে পারে হাইপারটেনশন ও অন্যান্য মেটাবলিক রোগের ঝুঁকি।
'ভালো ছাত্র' বলেই যে ঝুঁকি কম, তা নয়
কার্ডিওলজিস্টদের মতে, অনেক সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে সেই ছাত্রছাত্রীরাই, যারা পড়াশোনাকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে। নিয়মিত ব্যায়াম, বিশ্রাম, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো বা মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন— সবকিছুই পেছনে চলে যায়। ফলে বাইরে থেকে সফল ও পরিশ্রমী মনে হলেও ভেতরে ভেতরে শরীর ক্রমশ চাপের ভার বহন করতে থাকে।
স্ট্রেসের কবলে শৈশব! ছবি: সংগৃহীত
শুধু নম্বর নয়, জরুরি সুস্থ জীবনও
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার ও স্কুল— দু’পক্ষকেই এখন পড়ুয়াদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং মানসিক স্বস্তিকে পড়াশোনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখতে হবে।
চিকিৎসকদের কথায়, আজকের এই অবিরাম পারফরম্যান্সের সমাজে কিশোরদের হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষা করাও সমান জরুরি। কারণ, ভালো রেজাল্ট ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সুস্থ শরীর ও স্বাভাবিক মানসিক জীবন ছাড়া সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়।
