সকাল থেকে রাত— অফিসের কাজ, অনলাইন ক্লাস, মোবাইল স্ক্রল, গেমিং, চ্যাট, ই-মেল… এখন দিনের একটা বড় সময় কেটে যায় স্ক্রিনের সামনে। বাইরে থেকে দেখলে এই জীবন খুব আরামদায়ক মনে হতে পারে। নেই ভারী কাজ, নেই শারীরিক পরিশ্রম। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এই নিঃশব্দ জীবনযাপনই ধীরে ধীরে ক্ষতি করছে হাত, কবজি ও স্নায়ুর।
দিনের পর দিন একই ভঙ্গিতে টাইপ করা, মাউস চালানো বা ফোন স্ক্রল করার ফলে শরীরে তৈরি হচ্ছে এমন কিছু সমস্যা, যা একসময় স্থায়ী ক্ষতির কারণও হতে পারে।
সারাক্ষণ টাইপে বিপদ? ছবি: সংগৃহীত
প্রতি ঘণ্টায় হাজার বারের বেশি আঙুলের নড়াচড়া!
কম্পিউটারে কাজ করার সময় আমরা বুঝতেই পারি না, প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার বার আঙুল নড়ছে। একই ধরনের নড়াচড়া বারবার হতে থাকলে হাতের টেন্ডন, পেশি ও স্নায়ুর উপর চাপ বাড়তে থাকে। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় ভুল শারীরিক ভঙ্গি, কবজি বাঁকানো, হাতের সঠিক সাপোর্ট না থাকা বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিরতি ছাড়া কাজ, তাহলে সমস্যা আরও দ্রুত বাড়ে।
প্রথমদিকে বিষয়টা খুব সাধারণ মনে হয়। আঙুলে হালকা ঝিনঝিনি, কবজিতে টান, বুড়ো আঙুলে ব্যথা, মাঝে মাঝে হাত অবশ হয়ে যাওয়া— অনেকেই ভাবেন, 'এ তো ক্লান্তি।' কিন্তু এটাই হতে পারে রিপিটেটিভ স্ট্রেন ইনজুরি (RSI)-এর শুরু।
যেসব লক্ষণকে হালকাভাবে নিলে বাড়তে পারে বিপদ
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা বাড়তে পারে, হাতের গ্রিপ দুর্বল হয়ে যেতে পারে, এমনকী জিনিসপত্র ধরতেও অসুবিধা হতে পারে। অনেকের রাতে ঘুম ভেঙে যায় হাত অবশ হয়ে যাওয়ার কারণে। কারও টাইপ করার সময় আঙুলে জ্বালাভাব তৈরি হয়।
চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কার্পাল টানেল সিনড্রোম, টেন্ডোনাইটিস, ট্রিগার ফিঙ্গার, টেনিস এলবো এবং থাম্ব ওভারইউস ইনজুরির মতো সমস্যা। বিশেষ করে কার্পাল টানেল সিনড্রোমে হাতের স্নায়ুর উপর চাপ পড়ে। শুরুতে অবশ ভাব বা ঝিনঝিনি থাকলেও, চিকিৎসা না করালে পরে হাত দুর্বল হয়ে যেতে পারে, পেশি শুকিয়ে যেতে পারে, এমনকী আঙুলের নিয়ন্ত্রণও কমে যেতে পারে।
ব্যস্ত মোবাইল স্ক্রলে? ছবি: সংগৃহীত
কম বয়সিরাও কেন দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছেন?
একসময় এই ধরনের সমস্যা মূলত বয়স্ক অফিসকর্মীদের মধ্যে দেখা যেত। এখন ছাত্রছাত্রী, গেমার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর— প্রায় সকলেই ঝুঁকিতে। কারণ, অফিসের কাজ শেষ হলেও হাতের বিশ্রাম নেই। ল্যাপটপ থেকে ফোন, ফোন থেকে ট্যাব— এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে চলতেই থাকে আঙুলের কাজ। ওয়ার্ক ফ্রম হোম সংস্কৃতি, সঠিক চেয়ার-টেবিলের অভাব, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ছোট ছোট অভ্যাসই দিতে পারে বড় সুরক্ষা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাজের সময় কবজি সোজা রাখা, স্ক্রিন চোখের সমতলে রাখা, কিবোর্ড ও মাউস কনুইয়ের উচ্চতায় রাখা এবং দীর্ঘক্ষণ একভাবে না বসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি ৪৫ মিনিট বা ১ ঘণ্টা অন্তর ছোট বিরতি নেওয়া উচিত। কয়েক মিনিটের স্ট্রেচিং, আঙুল ও কবজি ঘোরানো, কাঁধ রিল্যাক্স করা— এই ছোট ছোট অভ্যাসই দিতে পারে বড় সুরক্ষা।
অনেকেই ব্যথা শুরু হওয়ার পরও কাজ চালিয়ে যান। সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ, স্নায়ু বা টেন্ডনের ক্ষতি একবার গুরুতর হলে তা পুরোপুরি সারানো কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কাজের মাঝে বিরতি নিন। ছবি: সংগৃহীত
ডিজিটাল যুগে হাতের যত্নও সমান জরুরি
কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যথা, অবশ ভাব বা হাত দুর্বল লাগলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে ফিজিওথেরাপি, কবজিতে স্প্লিন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ট্রিটমেন্ট বা অন্য কোনও চিকিৎসাও লাগতে পারে।
ডিজিটাল যুগে এখন শুধু চোখের যত্ন নিলেই হবে না, হাতের যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই হাতই দিনের পর দিন আপনার কাজ, যোগাযোগ আর জীবনের গতি ধরে রাখে। তাই স্ক্রিনের সামনে বসে থাকলেও শরীর যে চুপচাপ ক্ষয় হচ্ছে না— সেটা বুঝে সময় থাকতেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
