শেয়ার বাজারে লগ্নি করতে চান অনেকেই। এমন নতুন ইনভেস্টরের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কিন্তু সকলেই কি, সঠিক নিয়ম মেনে, সঠিক পথে এগোন? শেয়ার বাজার সম্পর্কে সকলের কি সম্যক জ্ঞান আদৌ রয়েছে? এই নিয়ে সব ধরনের ধন্দ কাটিয়ে সঠিক পথের সন্ধান দিলেন সাগর চৌধুরী
বর্তমানে মানুষ বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে পেতে চাইছে শেয়ার বাজারে। কিন্তু স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করার আগে বাজারকে ভাল করে বুঝে নিতে হবে। শুধুমাত্র রিটার্নের কথা মাথায় রেখে বাজারে বিনিয়োগ সঠিক সিদ্ধান্ত না-ও হতে পারে।
- কেন একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী শেয়ার বাজারে আসতে চাইছেন?
- স্টক মার্কেট থেকে কত রিটার্ন আশা করা উচিত?
- বাজারে কোন কোন বিষয় প্রভাব ফেলে?
এই ধরনের কিছু সাধারণ প্রশ্নের আগে উত্তর থাকাটা জরুরি।
প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা এ রকম হতে পারে। একজন বিনিয়োগকারী যিনি বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসকে ভেবেছেন এবং সেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে রিটার্ন পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই সেই বিনিয়োগকারীর মনে হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নির্দিষ্ট হারে রিটার্ন ঠিক বাজারের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। আর তখন সেই বিনিয়োগকারী অন্য ‘অপশন’ খুঁজবেন। এখান থেকেই আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন, সেই বিনিয়োগকারী যখন শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করবেন তখন তাঁর প্রথম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিস যে হারে রিটার্ন দিয়েছে, তার থেকে একটু বেশি রিটার্ন কীভাবে পাওয়া যায় সেটা সুনির্দিষ্ট করা। এই ক্ষেত্রে দেখা যায় বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী ঠিক কতটা রিটার্ন আশা করা উচিত শেয়ার বাজার থেকে সেটা অনেকক্ষেত্রেই মিস আউট করে যান।
আমি একটা সহজ অঙ্কের ফর্মূলা দিই। দু’টি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথম ইনফ্লেশন, দ্বিতীয় জিডিপি গ্রোথ। কোথায় পাবেন এই দুটি ডেটা? আরবিআই প্রতি দুই মাস অন্তর একটা করে মিটিং করে, আর সেই মিটিংয়ের আলোচনা থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয় ইনফ্লেশন এবং জিডিপি ডেটা কত শতাংশ হতে পারে। যেমন ধরুন, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আরবিআই জানিয়েছে, ইনফ্লেশন ২০২৭ অর্থবর্ষ পর্যন্ত থাকবে ৪.৮ এবং জিডিপি গ্রোথ হবে ৬.৭। আমি একজন সাধারণ ইনভেস্টর হিসেবে এই দু’টি নম্বর যোগ করব যা আসবে (৪.৮+৬.৭=১১.৫), তাহলে আমাকে ভাবতে হবে, কমপক্ষে আমি যদি আমার বিনিয়োগকে ১১.৫% হারে গ্রো করাতে পারি তাহলে আমার বিনিয়োগ দেশের যে গ্রোথ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে।
এবার এই হারে রিটার্ন পাওয়ার গ্যারান্টি কতটা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই আসবে তৃতীয় প্রশ্ন। কোন কোন বিষয় শেয়ার বাজারে প্রভাব ফেলে? আর এই প্রশ্নের সাথেই লুকিয়ে আছে স্টক মার্কেটে রিস্ক কতটা?
শেয়ার বাজারে খুব অল্প সময়ে বা শর্টটার্মে প্রভাব ফেলে সেন্টিমেন্ট, এবং লংটার্মে প্রভাব ফেলে কোম্পানি গ্রোথ। যেমন এই লেখাটা যখন লেখা হচ্ছে তখন ইরান ও ইজরায়েলের যুদ্ধ মার্কেটকে প্রভাবিত করেছে। সঙ্গে বিশ্বের সমস্ত বাজারের নজর থাকছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী মন্তব্য করছেন তার উপর। এটা হয়ে গেল শর্টটার্মে প্রভাব, এবার লংটার্মে প্রভাব। এই বিষয়টা একটু অন্য ভাবে বলি। কারণ, এখানেই আছে শেয়ার বাজারকে গভীর ভাবে জানার বিষয়। আপনাকে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, শেয়ার মার্কেটে রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, এবার বিনিয়োগকারী হিসেবে আপনাকে সেই কোম্পানিগুলোকে বুঝতে হবে। প্রথম বুঝতে হবে, যে কোম্পানির শেয়ার আপনি বিনিয়োগ করছেন সেই কোম্পানি আগামী কুড়ি থেকে তিরিশ বছর তার ব্যবসাটা ভাল ভাবে করতে পারবে তো? না কিছু বছর পর ব্যবসা বিভিন্ন কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে? আর যদি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তাহলে সেই চ্যালেঞ্জকে পার করতে পারবে তো? এই কিছু সহজ সরল প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নের উত্তরেই থাকবে শেয়ার বাজারে লংটার্মে কী হতে চলেছে?
একটা বিষয় মনে রাখতে হবে শেয়ার মার্কেটকে বলা যেতে পারে দেশের অর্থনীতির আয়না। তাই বড় বড় কোম্পানিগুলো ভাল ব্যবসা বাণিজ্য করলে তবেই দেশের অর্থনীতি গ্রো করবে। পাশাপশি স্টক মার্কেটও গ্রো করবে।
লেখক এনআইএসএম সার্টিফায়েড ইক্যুইটি রিসার্চ অ্যানালিস্ট
