Advertisement
দেশের 'ব্ল্যাক ম্যাজিক' রাজধানী! আশ্চর্য এই ছোট্ট গ্রামই এবার হয়ে উঠুক আপনার 'ডেস্টিনেশন'
লোকমুখে মায়ং পরিচিত ভারতের 'ব্ল্যাক ম্যাজিক ক্যাপিটাল' হিসেবে। এককালে যে নাম শুনলে মানুষ ভয় পেত, এখন সেই টানেই সেখানে ভিড় জমান পর্যটকরা। শান্ত গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণায় যেন জড়িয়ে আছে পুরনো দিনের সেই রহস্যময় আবেশ।
অসমের গুয়াহাটি থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরত্ব। ব্রহ্মপুত্রের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক রহস্যময় জনপদ। মায়ং। পাহাড় আর সবুজে ঘেরা এই শান্ত গ্রামটি এককালে পরিচিত ছিল ভারতের তন্ত্রমন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে।
লোকমুখে মায়ং পরিচিত ভারতের 'ব্ল্যাক ম্যাজিক ক্যাপিটাল' হিসেবে। এককালে যে নাম শুনলে মানুষ ভয় পেত, এখন সেই টানেই সেখানে ভিড় জমান পর্যটকরা। শান্ত গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণায় যেন জড়িয়ে আছে পুরনো দিনের সেই রহস্যময় আবেশ।
মায়ং-এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অজস্র গল্প। শোনা যায়, মহাভারতের বীর ঘটোৎকচ এখানেই জাদুবিদ্যা শিখেছিলেন। প্রাচীনকালে এই গ্রামের তান্ত্রিকরা নাকি শত্রুপক্ষকে নিমেষে অদৃশ্য করে দিতেন। বুনো বাঘকে পোষ মানানো থেকে শুরু করে হাতের তালুতে জাদু দেখানো— মায়ং-এর বাসিন্দাদের কাছে ছিল জলভাত। এই সব লোকগাথাই আজ গ্রামটিকে বিশ্বের দরবারে অনন্য করে তুলেছে।
মায়ং-এর মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এখানকার 'বেজ' বা ওঝারা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাঁরা এই বিশেষ বিদ্যা আয়ত্ত করে এসেছেন। তাঁরা মূলত মন্ত্রের সাহায্যে বিভিন্ন রোগ সারাতে পারদর্শী ছিলেন। এই বিদ্যাকে তাঁরা মা কামাখ্যার আশীর্বাদ মনে করতেন। বর্তমানে জাদুর প্রকোপ অনেকটা কমলেও, প্রবীণদের স্মৃতিতে এবং পুরনো পুঁথির পাতায় আজও সেই গৌরবময় দিনগুলোর উল্লেখ মেলে।
গ্রামের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত 'মায়ং সেন্ট্রাল মিউজিয়াম অ্যান্ড এম্পোরিয়াম'। জাদুর রহস্যকে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতেই এই মিউজিয়াম তৈরি হয়েছে। এখানে সংরক্ষিত আছে প্রাচীন সব পাণ্ডুলিপি এবং তুকতাক করার বিভিন্ন সরঞ্জাম। পর্যটকদের জন্য এটিই হল মায়ং-এর মূল আকর্ষণের জায়গা।
এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ১৩ থেকে ১৯ শতকের প্রাচীন সব মন্ত্র পুঁথি। সাঁচি গাছের ছাল বা হাতে তৈরি কাগজে লেখা এই পুঁথিগুলো আজও অমলিন। সেখানে লেখা আছে নানা ধরনের রোগের প্রতিকার এবং বিচিত্র সব মন্ত্রের কৌশল। বিরল সব লিপিতে লেখা এই পুঁথিগুলো মায়ং-এর প্রাচীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে রয়ে গিয়েছে।
জাদুঘরের সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন সব অস্ত্রশস্ত্র। তার মধ্যে বড় আকারের তলোয়ার বিশেষ নজর কাড়ে। লোকমুখে শোনা যায়, প্রাচীনকালে এখানে নরবলির মতো প্রথা প্রচলিত ছিল। বলাইবাহুল্য এই তলোয়ারগুলো সেই কাজেই ব্যবহৃত হত। এছাড়া মাটি খুঁড়ে পাওয়া পোড়ামাটির মূর্তি এবং বিচিত্র আকৃতির পাত্রগুলো গ্রামের প্রাচীন তান্ত্রিক আচার ব্যবস্থার নিদর্শন।
শুধু তন্ত্রবিদ্যা নয়, প্রকৃতির স্পর্শেও মায়ং অনন্য। ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ চরা আর পাশের অভয়ারণ্য মিলিয়ে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানে। বুনো গণ্ডারের ডাক আর কালা জাদুর বিচিত্র রহস্যময় গল্প— দুইয়ে মিলে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা মিলবে। পর্যটকদের কাছে এ যেন বাড়তি পাওয়া।
এককালের সেই ভয়ংকর কালা জাদুর গ্রাম এখন একটি হেরিটেজ পর্যটন কেন্দ্র। মানুষ এখন ভয়ে নয়, জানার আগ্রহ নিয়ে মায়ং-এ আসেন। গ্রামের বাসিন্দারাও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা। তাঁরা পর্যটকদের পুরনো গল্প শোনান। তন্ত্রমন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী পরম্পরার সঙ্গে পর্যটকদের পরিচিত করান।
মায়ং-এর প্রাচীন চিকিৎসার ঐতিহ্য আজও কিছুটা টিকে আছে। স্থানীয় বেজরা জড়িবুটি এবং ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে ব্যথা বা ছোটখাটো সমস্যার সমাধান করেন বলে শোনা যায়। তবে ২০২৪ সালে অসম সরকার 'অসম হিলিং প্র্যাকটিস বিল' পাস করেছে। এর উদ্দেশ্য হল ক্ষতিকর কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক জাদু চিকিৎসা বন্ধ করা। পর্যটকরা এখানে জাদু দেখতে এলেও গ্রামের মূল ধারা এখন অনেক বেশি সচেতন।
Published By: Buddhadeb HalderPosted: 07:31 PM Apr 03, 2026Updated: 07:31 PM Apr 03, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
