Advertisement
দেবদেবীর অপমান থেকে মা-বাবাকে নিয়ে যৌনগন্ধী মন্তব্য! 'ভাঁড়ামো'য় আইনি বিতর্কে পড়েন যে কৌতুকশিল্পীরা
প্রশ্ন উঠেছে, 'ভারতের নবীন প্রজন্মের মূল্যবোধ কতটা তলিয়ে গিয়েছে যে মা-বাবাকে নিয়েও নোংরা মন্তব্য করতে পিছপা হয় না।'
জনসাধারণের পেটে খিল ধরানোর কাজ মোটেই সহজ নয়! ব্যস্ত রোজনামচার ভিড়ে মানুষ আজকাল যত হাসতে ভুলে যাচ্ছে, ততই স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানদের কদর বাড়ছে। কিন্তু কৌতুকশিল্পীদেরও সবসময়ে তটস্থ থাকতে হয়, এই না কারও ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগে কিংবা নির্ভেজাল রসিকতায় কখন করা মনোক্ষুণ্ণ হয়। ভারতের বর্তমান প্রজন্মের এহেন একাধিক স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান রয়েছেন, কৌতুকশিল্পের জেরে যাদের আইনি বিপাকে পড়তে হয়েছে।
সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে সময় রায়নার 'ইন্ডিয়াস গট ল্যাটেন্ট' শোয়ের কথা ধরা যাক। যেখানে মা-বাবা যৌনগন্ধী মন্তব্য করে মারাত্মক বিতর্কের শিকার হয়েছিলেন রণবীর এলাহাবাদিয়া। গোটা পঁচিশ সালজুড়ে তাঁকে নিয়ে কম চর্চা হয়নি। মামলা গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। একটা বিতর্কিত মন্তব্যের জেরেই রাতারাতি বদলে গিয়েছিল রণবীর এলাহাবাদিয়ার জীবন! বলেছিলেন, "বছরভর বাবা-মায়ের যৌনতা দেখবে, নাকি একবার যোগ দিয়ে সেটা চিরকালের জন্য বন্ধ করে দেবে?"
মা-বাবাকে নিয়ে ইউটিউবারের অশ্লীল রসিকতায় চটেছিল গোটা দেশ। একের পর এক কটাক্ষাবাণে হু-হু করে কমে গিয়েছিল এলাহাবাদিয়ার সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যাও। ছিছিক্কার পড়ে যায় দেশজুড়ে। 'ভারতীয় সংস্কৃতি', 'পারিবারিক পরম্পরা ও ঐতিহ্য'কে অসম্মানের অভিযোগে ইউটিউবারের বিরুদ্ধে অসম থেকে মহারাষ্ট্রের একাধিক থানায় অভিযোগও দায়ের হয়। পড়তে হয়েছিল জাতীয় মহিলা কমিশনের জেরার মুখেও। তবে বিতর্ক অধ্যায় সরিয়ে ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছেন তিনি।
২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে ইন্দোরে একটি শো চলাকালীন বিজেপি বিধায়ক মালিনী গৌরের ছেলে তথা হিন্দ রক্ষক সংগঠনের প্রধান একলব্য গৌরের অভিযোগের ভিত্তিতে মুনাওয়ার ফারুকীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কী অপরাধ ছিল? অভিযোগ, অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই রসিকতার নামে হিন্দু দেবদেবী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও গোধরা কাণ্ড নিয়ে একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করছিলেন মুনোয়ার ফারুকি। সেই মন্তব্যের বিরোধিতা করে সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান বন্ধের আরজি জানান হিন্দ রক্ষক সংগঠনের সদস্যরা। কিন্তু তাতে কান দেয়নি কফিশপ কর্তৃপক্ষ।
যার ভিত্তিতে মুনাওয়ার ফারুকী-সহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযোগ, আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় ধৃতদের হেনস্তা করেন একলব্য গৌর ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা। তবে পালটা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫(ক) ধারায় ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত, ২৬৯ ধারা-সহ একাধিক ধারায় মামলা করেছিল মধ্যপ্রদেশ পুলিশ। বিতর্কের জেরে একুশ সালে একমাস জেলে ছিলেন ফারুকী।
গত কয়েক বছরে কুণাল কামরা তাঁর রাজনৈতিক শ্লেষাত্মক মন্তব্যের জেরে একাধিক আইনি বিতর্কে জড়িয়েছেন। ২০২৫ সালে একনাথ শিণ্ডেকে 'গদ্দার' বলে শিবসেনার তীব্র রোষানলে পড়েছিলেন। গত বছর মার্চ মাসে মুম্বইয়ের এক হোটেলে কৌতুক পরিবেশনের সময় শিব সেনার দ্বিখণ্ডিত হওয়াকে ব্যাঙ্গ করেছিলেন কুণাল। নাম না করে একনাথ শিণ্ডেকে ‘গদ্দার’ বলেন। জনপ্রিয় হিন্দি গানের প্যারোডির সেই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই তেতে ওঠেন শিণ্ডে সমর্থকরা। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিও সরগরম হয়ে উঠেছিল।
কামরার ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, শিণ্ডে ইস্যুতে মামলা দায়েরের পাশাপাশি কমপক্ষে ‘৫০০টি হুমকি ফোন’ পান কুণাল। যে হোটেলে এই শো রেকর্ড করা হয়েছিল, সেখানেও হামলা চালায় শিব সেনা (শিণ্ডে) সমর্থকরা। পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবিসেরও রোষের মুখে পড়েন কুণাল। ফড়ণবিসের দাবি ছিল, অবিলম্বে কুণালের ক্ষমা চাওয়া উচিত। যদিও নিজের বক্তব্যে অনড় থেকে কুণাল জানিয়ে গিয়েছেন, ক্ষমা তিনি চাইবেন না। একবছর পরও নিজের মন্তব্যে অনড় শিল্পী।
২০২১ সালে কেনেডি সেন্টারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভারতের বৈপরীত্য নিয়ে বীর দাসের ‘টু ইন্ডিয়াজ’ কবিতা ঝড় তুলেছিল। সেসময় প্রশংসার চেয়েও বীরের কপালে জুটেছিল আইনি নোটিশ আর চরম লাঞ্ছনা! মুম্বইতে তার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয় এবং অনেকেই অভিযোগ করেন যে, ওই মনোলগটি আদতে ‘ভারতের অপমান’। কৌতুকশিল্পীর বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের কাছেও একাধিক অভিযোগ দায়ের হয় সেসময়ে। তবে উল্লেখ্য, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেটের সময়ে বীর দাসের ওই মনোলগ পাঠ করে চর্চার শিরোনামে নাম লেখান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যা কৌতুকশিল্পীকেও হতবাক করে দিয়েছিল।
রাম রহিমকে নকল করার দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কিকু শারদা। কপিল শর্মার কমেডি শো-তে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সুপরিচিত তিনি। ২০১৬ সালে হরিয়ানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল। কারণ বিতর্কিত ধর্মগুরু গুরমিত রাম রহিম সিংকে নকল করেছিলেন তিনি।
কিকুর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগ আনা হয় এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫ এ ধারায় (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে বিদ্বেষমূলক কাজ) এফআইআর দায়ের করা হয়। তাঁকে ১৪ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছিল। তবে, কিকু শারদা পরবর্তীতে ক্ষমা চেয়ে নেন এবং জানান যে, কারও অনুভূতিতে আঘাত করার কোনও উদ্দেশ্যই তাঁর ছিল না।
২০২০ সালে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের একটি প্রস্তাবিত মূর্তি নিয়ে কমেডি করায় আগ্রিমা জোশুয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫এ ধারা (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে বিদ্বেষমূলক কাজ) এবং ১৫৩এ ধারায় (শত্রুতা ও ঘৃণা প্রচার) এফআইআর দায়ের করা হয়। তবে, নেটপাড়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ার পর জোশুয়া ক্ষমা চেয়ে একটি বিবৃতি দেন।
Published By: Sandipta BhanjaPosted: 09:53 PM Apr 10, 2026Updated: 09:53 PM Apr 10, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
