Advertisement
কফিনে শুয়েই মিলবে স্বস্তি! শান্তির খোঁজে ট্রেন্ডিং 'আজব খেলা', সতর্ক করছেন মনোবিদরা
জাপান, থাইল্যান্ড থেকে সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়ছে কফিন সেশন!
'এই খেদ মোর মনে, ভালোবেসে মিটল না আশ, কুলাল না এ জীবনে। হায়, জীবন এত ছোট কেনে?' তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কবি' উপন্যাসের নিতাইয়ের এই আক্ষেপ, এই প্রশ্ন কেবল তারই নয়। সেই আদিম যুগ থেকেই মানুষ ভেবে এসেছে জীবনমৃত্যুর এই আশ্চর্য ধাঁধা নিয়ে। কুল পায়নি। জাপান, থাইল্যান্ডে এই মুহূর্তে ট্রেন্ডিং কফিন সেশনের নেপথ্যেও বোধহয় রয়ে গিয়েছে সেই বিস্ময়বোধই!
কী এই কফিন সেশন? ব্যাপারটা শুরু হয় ২০২৪ সালে। জাপানের এক শতাব্দীপ্রাচীন সৎকার সংস্থা শুরু করে 'ইনটু কফিন ক্যাফ' পরিষেবা। ওই সংস্থার সভাপতি কাজিয়া হন্টেন সেই সময় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ''আমরা চেয়েছি মানুষ ছবি তুলুক, প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ নিক। পাশাপাশি এটাও চাই জীবনে যাঁরা স্থবিরতা অনুভব করছেন, তাঁরাও কফিনের ভেতরে প্রবেশ করে দেখুন।''
ওই সংস্থার মত ছিল, কফিন থেকে বেরিয়ে আসা পুনর্জন্মের প্রতীক। নতুন করে জীবন শুরু করার একটি সুযোগ। রাতারাতি সাড়া পড়ে গিয়েছিল এমন এক সেশনে। ২০২৬ সালে এসে তা ট্রেন্ডিং হয়ে উঠেছে জাপানে। পাশাপাশি থাইল্যান্ডেও পালিত হয় 'মৃত্যু উৎসব'। নশ্বরতাকে সম্মান জানাতে মানুষ কফিনে এসে শুয়ে থাকে। ক্রমশ এই প্রবণতা ছড়াচ্ছে বিশ্বের অন্যত্রও।
কফিন সেশনে যে কফিন ব্যবহৃত হচ্ছে তা সব সময় সাধারণ বাদামি কফিন নয়। কারও ক্ষেত্রে সেই কফিনের ভিতরে লাগানো থাকে আয়না। আধঘণ্টা কফিনে শুয়ে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখেন অনেকে। কফিনটি খোলা থাকবে নাকি বন্ধ রাখা হবে, সেটাও ঠিক করে নেওয়া হয়। সেশন চলাকালীন অনেকের সঙ্গে থাকে প্রিয় গান বা সুর। কেউ প্রিয় দৃশ্যে চোখ রাখেন। আবার অনেকেই চান সম্পূর্ণ নৈঃশব্দ্য।
এই ভাবেই প্রত্যেকের পছন্দ অনুযায়ী বানানো হয় তাঁদের কফিন। কফিনের মধ্যে কোনও নির্দিষ্ট ছবি থাকবে কিনা সেটাও তাঁরা ঠিক করে নেন। তারপর সেইমতো নির্দিষ্ট একটা সময় কাটিয়ে আসেন কফিনের ভিতরে। 'শ্মশান বৈরাগ্য' বলে একটি কথা রয়েছে। শ্মশানে চিতার আগুনের দিকে তাকালে বোঝা যায় জীবনের অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর ধ্রুবক অস্তিত্বকে। কফিন সেশনও যেন সেই অনুভবের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
বহু মানুষই জানিয়েছেন, কফিনের ভিতরে কাটানো আধঘণ্টা তাঁদের জীবনদর্শন বদলে দিয়েছে। জীবন যে কতটা মূল্যবান, তা তাঁরা নতুন করে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। কিন্তু এই সব অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেও কফিন সেশন নিয়ে সতর্ক করছেন মনোবিদরা। জানিয়েছেন, এই অভিজ্ঞতা মানসিক প্রশান্তির পরিবর্তে উৎকণ্ঠা জাগিয়ে তুলতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। বিশেষ করে আত্মহত্যাপ্রবণদের মানসিক অশান্তি আরও প্রবল হয়ে উঠতে পারে।
এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় আবসি স্যাম নামের এক মনোবিদ জানিয়েছেন, যদি নিরাপদ, বিশ্বাসযোগ্য ও পেশাগত ভাবে এই সেশন করানো হয় তাহলে সদর্থক ফল মিলতেই পারে। কিন্তু তবুও যাঁরা মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন তাঁদের এমন সেশন থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয় বলে জানাচ্ছেন তিনি।
ওই মনোবিদের ব্যাখ্যা, “গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মৃত্যু-সম্পর্কিত উদ্দীপনার সংস্পর্শে এলে মনের ভিতরের প্রবল আবেগগুলি তীব্রতর হয়ে উঠতে পারে। এবং মৃত্যুর চিন্তায় আচ্ছন্ন করতে পারে সেই মানুষটিকে। মনের ভিতরে হতাশা, মূল্যহীনতা এবং একাকিত্বের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে। আসলে সব মানুষের আবেগ ও তার নিয়ন্ত্রণ সমান হয় না। কারও কাছে সেটা সদর্থক, কারও কাছে সেটা নঞর্থক হয়ে উঠতেই পারে।”
ওই মনোবিদের মতে, আর যাই হোক, এটা কোনও থেরাপি নয়। বড়জোর এটাকে একধরনের কর্মকাণ্ড বলা যেতে পারে। যা মনকে শান্ত করতে পারে। অনেকটা ধ্যানের মতো ফল মিলতে পারে। কিন্তু যথাযথ আবেগঘন সমর্থন দরকার। সেশন শেষেও দরকার যথার্থ ভালোবাসা। অন্যথায় মন পিছলে যেতে পারে কোনও অনিশ্চিত অন্ধকার, বিষাদের হাঁ-মুখ আঁধারে!
সব মিলিয়ে ট্রেন্ডিংয়ে গা না ভাসিয়ে বিষয়টিকে বিবেচনা করা দরকার বলেই মনে করছেন মনোবিদরা। অন্যথায় হিতে বিপরীত হতে পারে। হালের পৃথিবীতে ট্রেন্ডিংয়ে গা ভাসানোর যে প্রবণতা, সেটা এক্ষেত্রে একেবারেই খাটে না। রীতিমতো মজবুত মানসিক গঠন না থাকলে কফিনে শোওয়ার মতো সেশনে যোগ না দেওয়াই ভালো। তা যতই ট্রেন্ডিং হয়ে উঠুক না কেন।
Published By: Biswadip DeyPosted: 05:54 PM Apr 10, 2026Updated: 05:56 PM Apr 10, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
