Advertisement
ম্যাচ জিতিয়ে স্ত্রীকে ভিডিও কল সঞ্জুর, মুখ খুললেন 'ঈশ্বর স্মরণে'র সেলিব্রেশন নিয়েও
কী বলেছেন নানান উত্থান-পতনের সাক্ষী এই সঞ্জু?
ভারতীয় দলে যেন 'পার্শ্বচরিত্র' হয়ে উঠেছিলেন সঞ্জু স্যামসন। নানান উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছেন তিনি। নিজের পছন্দের জায়গাও পর্যন্ত হারাতে হয়েছে। অন্য পজিশনে খেলেছেন। দল থেকে বাদ পড়েছেন। আবারও নিজের পছন্দের জায়গায় ফিরে এসেছেন। আর ফিরেই ৫০ বলে ৯৭ রানের ইনিংস খেলে ভারতকে সেমিফাইনালে তুলেছেন 'নামুদে সঞ্জু'। তিনিই যেন রিয়েল 'কেরালা স্টোরি' লিখলেন।
কেরলের ভূমিপত্র তিনি। অসাধারণ এই ইনিংসের পর তাঁর নামে হ্যাস ট্যাগ নেমেছে। সোশাল মিডিয়ায় তাঁর প্রশংসায় লেখা হচ্ছে 'নামুদে সঞ্জু'। যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, 'আমাদের সঞ্জু'। সেই সঞ্জু ম্যাচ জিতিয়ে তাঁর স্ত্রী চারুলতা রমেশকে ভিডিও কল করেন। ক্যামেরার দিকে তিনি মোবাইল ঘুরিয়ে দেখান।
দলকে যে তিনি ভরসা জোগাতে পারেন, এই বিশ্বাস সঞ্জুর প্রতি সব সময় ছিল চারুলতার। যখন খারাপ সময় চলছিল, সেই সময় ভারতীয় উইকেটরক্ষকের পাশে থেকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। ২ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। নিউজিল্যান্ড সিরিজ চলছিল। ফর্ম হাতড়াচ্ছিলেন। চারুলতা লেখেন, 'সব কিছু করা হলেও উত্তর অস্পষ্ট থাকে। সেই সময় মাথা নিচু করে জীবনকে চলতে দাও। কিছু সময়ে পরিস্থিতিতে গ্রহণ করতে হয়। ব্যাখ্যা করলে চলে না।' এবার সঞ্জুর পালা। দেশকে জিতিয়ে তাঁর অনুপ্রেরণাকেই তিনি এভাবে নীরবেই কৃতিত্ব দিলেন।
তাঁর জীবনের প্রেমের গল্প ক্রিকেট যাত্রার মতোই মনোমুগ্ধকর। স্ত্রী চারুলতা রেমেশের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়েছিল কলেজ জীবনে। তিরুঅনন্তপুরমের ইভানিওস কলেজে পড়াশোনা করতেন তাঁরা। গোটা কলেজেই চর্চা ছিল তাঁদের প্রেম নিয়ে। ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বর বিয়ের বাঁধনে বাঁধা পড়েন তাঁরা। যদিও তাঁদের প্রেম আরও পাঁচ বছর আগে থেকে।
২০১৩ সালের ২২ আগস্ট। ঘড়িতে তখন রাত ১১.১১ মিনিট। চারুলতাকে ‘হাই’ লিখে একটি মেসেজ করেন। সেখান থেকেই কথা শুরু। প্রথমে বন্ধুত্বের অনুরাগ। সেই অনুরাগ থেকে প্রেম। তারপর সংসার। কলেজের পর দু'জনের দেখা হয়নি বহুদিন। কেরিয়ারে মনোনিবেশ করেছিলেন তাঁরা। হিউম্যান রিসোর্সে বিএসসি চারুলতা। স্নাতকোত্তরও করেছেন। কিন্তু দূরত্ব পছন্দ হয়নি সঞ্জুর। চারুলতাকে মেসেজ করেও উত্তর পাননি। এরপর সঞ্জু সটান চলে গিয়েছিলেন চারুলতার কলেজে। চারুলতা সঞ্জুর বড় সমর্থক। বহুবার তাঁকে গ্যালারিতে দেখা গিয়েছে সঞ্জুর হয়ে গলা ফাটাতে। তা সে আন্তর্জাতিক পর্যায়েই হোক কিংবা আইপিএল। ইডেনে অবশ্য তিনি গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তাতে কী? ম্যাচের পর ভিডিও কলে কথা বলে কৃতিত্ব দিলেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, সঞ্জু স্যামসনের মোট সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ৮০-৯৫ কোটি টাকা। এই উপার্জনের প্রধান উৎস হল তার আইপিএল চুক্তি, বিসিসিআইয়ের বার্ষিক চুক্তি এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন। এছাড়া কেরলে তাঁর ৬ কোটি মূল্যের বিলাসবহুল বাংলো রয়েছে। কিন্তু বিষয়ের চেয়ে বড় দেশের সম্মান। ম্যাচ জিতিয়ে মাঠে বসে পড়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান সঞ্জু। এরপর সাজঘরে গিয়ে ব্যাটে চুম্বন। বোঝাই যাচ্ছিল, ইনিংসটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সঞ্জুর ব্যাটেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় রান তাড়া নজির টিম ইন্ডিয়া। প্রশ্ন হল, মাঠে ঈশ্বর স্মরণের সেলিব্রেশনের নেপথ্য কারণই বা কি?
ম্যাচের পর সঞ্জু বললেন, "যেদিন থেকে ক্রিকেট খেলা শুরু করেছি, যেদিন থেকে দেশের জন্য খেলছি, সেদিন থেকে এই ইনিংসটার জন্য অপেক্ষা করেছি। আমার ক্রিকেট সফরে বহু উত্থান-পতন ছিল। নিজের ক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছি। ভাবতাম, আমি কি পারব? কিন্তু এই দিনটার জন্য ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ।" আর বিশেষ সেলিব্রেশন নিয়ে বললেন, "এটা খুবই বিশেষ মুহূর্ত ছিল আমার জন্য। কিছু কিছু বিষয়ে বিশ্বাস করি আমি। সেই কারণে এমন সেলিব্রেশনের অর্থ প্রকাশ্যে আনতে চাই না। কেন এভাবে সেলিব্রেশন, সেই কারণটা ব্যক্তিগতই থাক।"
সেই সঞ্জুর ব্যাটেই যেন সূর্যোদয় হয়েছে টিম ইন্ডিয়া। তবে ম্যাচটা মোটেও সহজ ছিল না। তার উপর ইডেনের কোয়ার্টার-যুদ্ধে নামার আগে হুঙ্কার দিয়েছিলেন ক্যারিবিয়ানদের কোচ ড্যারেন সামি। কিন্তু ‘সুপার’ সঞ্জুর ব্যাটে বিদ্ধ হলেন তাঁরা। যিনি এতদিন ‘বঞ্চিত’ ছিলেন, সেই সঞ্জু স্যামসনই ডু অর ডাই ম্যাচে ৫ উইকেটে জিতিয়ে সেমিফাইনালে তুললেন ভারতকে।
এমন একটা ইনিংসের পর সঞ্জু বন্দনায় মেতেছে আসমুদ্রহিমাচল। প্রত্যেকে বলছেন, এমন ইনিংস ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।দলকে জিতিয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে সঞ্জুকে টুপি খুলে কুর্নিশ জানান অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। কুর্নিশ জানানো ছাড়া উপায় কী? ভারত অধিনায়ক বলে গেলেন, "আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি ভালো মানুষদের সঙ্গে ভালোই হয়। তবে অপেক্ষা করতে হয়, ধৈর্য ধরতে হয়। যখন সঞ্জু খেলছিল না, তখনও নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করে গিয়েছে। সঠিক সময়ে এসে তার ফল পেল। সাহসীরাই ম্যাচ জেতায়। সঞ্জু সেটাই করেছে। ওর পরিবারকে শুভেচ্ছা। আশা করব, পরের দু’টো ম্যাচেও ও এমন পারফরম্যান্স করবে।"
ওই সময়টায় জড়িয়ে ধরেন অধিনায়ককে? ক্যাপ্টেনকে কী বলেছিলেন ওপেনিং ব্যাটার? “রুলায়েগা ক্যায়া পাগলে?” (কাঁদাবি নাকি পাগল?)। যা শুনে একপ্রকার ঘোরে থাকা সূর্য বলেন, “অনেক কিছুই তো বলার ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে কী বলব বুঝতে পারছি না!”
ম্যাচের পর ভারতীয় দলের উইকেটরক্ষক আরও বলেন, “আমি বহু বছর ধরে এই ফরম্যাটে খেলছি। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, মহেন্দ্র সিং ধোনিদের মতো ক্রিকেটারদের থেকে শিখেছি। সেটা আমাকে পরিপক্ব হতে সাহায্য করেছে। আমি দেখেছি এই কিংবদন্তিরা কীভাবে খেলেন, কীভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার গতি বদলান। সেভাবেই খেলেছি। কখনও ভাবিনি এরকম একটা ইনিংস খেলব। আজকের দিনটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা দিন।”
Published By: Prasenjit DuttaPosted: 05:00 PM Mar 02, 2026Updated: 05:03 PM Mar 02, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
