Advertisement
বাবার স্বপ্নে ঘাম মিশিয়ে বাস্তবের রূপকথা তৈরি করেছেন যাঁরা, মাতিয়েছেন আইপিএল
বহু ক্রিকেটারের কাছে ক্রিকেট বাবার স্বপ্ন পূরণ, সংগ্রামের সফল সমাপ্তির মঞ্চ।
ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়, বহু স্বপ্ন, ত্যাগ আর আবেগের এক অনন্য মিশেল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে উঠে আসা তরুণ ক্রিকেটারদের জীবনের গল্পে বারবার উঠে আসে পরিবারের সংগ্রাম আর অনুপ্রেরণার কথা। বহু ক্রিকেটারের কাছে তা বাবার স্বপ্ন পূরণ, সংগ্রামের সফল সমাপ্তির মঞ্চ। মুকুল চৌধুরী থেকে প্রফুল হিঙ্গে, এমন বহু ক্রিকেটারই বাবার স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন।
মুকুল চৌধুরী: দেশের ক্রিকেটভক্তরা এতক্ষণে নামটা জেনে গিয়েছে। কেকেআরের বিরুদ্ধে ২৭ বলে ৫৪ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে লখনউ সুপার জায়ান্টসকে ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। ছোটবেলায় আর্থিক সংকটের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে আইপিএলের মঞ্চ পর্যন্ত এসেছেন। ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্নে বাবাকে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। মজার বিষয়, মুকুল জন্মানোর বহু আগেই বাবা দলীপ চৌধুরী ঠিক করে রেখেছিলেন, তাঁর ছেলে ক্রিকেটারই হবে।
দলীপের পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিল না। সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি জমি কেনাবেচার ব্যবসায় নামেন। প্রায় দশ বছর আগে বাবা-ছেলে রাজস্থানের ঝুনঝুনু থেকে শিকারের এসবিএস ক্রিকহাবে যান ক্রিকেট প্রশিক্ষণের জন্য। টাকার অভাবে বাড়ি বিক্রি করে ২১ লক্ষ টাকা জোগাড় করেন দলীপ। পরে লোন নিয়ে হোটেল ব্যবসা শুরু করলেও তা ব্যর্থ হয়।
সেই নিদারুণ আর্থিক সংকটে আত্মীয়স্বজনরা সঙ্গ ছেড়ে দেন। লোকে তাঁকে পাগল বলত। তাতে বাবা-ছেলের জেদ আরও বেড়েছে। লোকে যত খারাপ কথা বলেছে, তত বিশ্বাস করেছেন যে তিনি ঠিক পথে আছেন। সেই ঠিক পথ এসে মেশে আইপিএলের মাঠে। অনেক সমস্যা, ব্যর্থতা আসতেই পারে। কিন্তু বাবা-ছেলের গল্প অনুপ্রাণিত করতে পারে বহু মানুষকে।
প্রফুল হিঙ্গে: সোমবার রাতে আইপিএলে স্বপ্নের অভিষেক হয়েছে বিদর্ভের এই পেসার। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের জার্সি গায়ে ৩৪ রানে ৪ উইকেট নিয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন। প্রফুল্লর বাবা প্রকাশ হিঙ্গে নিজে পেসার হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। সরকারি চাকরি করা বাবা নিজের স্বপ্ন ছেলের মাধ্যমে পূরণ করতে ভোরের আলোয় মাঠে ছুটতেন। ৩০ লক্ষ টাকায় সানরাইজার্সে সুযোগ পেয়ে প্রফুল তাঁর বাবার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।
শুধু নিজের স্বপ্ন নয়, বাবাকে দেওয়া কথাও রেখেছেন প্রফুল। রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে ম্যাচ শেষে প্রকাশ জানান, প্রফুল তাঁকে নাগপুরের একটি অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করানোর অনুরোধ করেছিলেন। শুরুতে খরচের কারণে তিনি দ্বিধায় ছিলেন। সেই কারণে পড়াশোনায় মন দিতে বলেছিলেন। তবে ছেলের জেদের কাছে হার মেনে শেষ পর্যন্ত তাঁকে রেশিমবাগ জিমখানা ক্লাবে ভর্তি করান। তারপর বাকিটা ইতিহাস।
শিবাঙ্গ কুমার: সানরাইজার্স হায়দরাবাদের তরুণ বাঁহাতি এই রিস্ট স্পিনার ঘরোয়া ক্রিকেটে মধ্যপ্রদেশের হয়ে খেলেন। উত্তরপ্রদেশের এই প্রতিভা নিজের বাবার অপূর্ণ স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বাবা প্রবীণ কুমার বাংলার অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেললেও পারিবারিক কারণে থেমে যেতে বাধ্য হন। বাবার সেই অসম্পূর্ণ যাত্রাকেই পূর্ণতা দিতে মাঠে নামছেন শিবাঙ্গ। এবার ৩০ লক্ষ টাকায় সানরাইজার্সে যোগ দিয়েছেন তিনি।
বৈভব সূর্যবংশী: অর্থাভাবে একটা সময়ে ছেলের ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন শেষ হতে বসেছিল। কিন্তু হাল ছাড়েননি বাবা। নিজের শেষ সম্বল, একফালি জমি বিক্রি করে ছেলের স্বপ্নপূরণের রসদ জুগিয়েছেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা সেই ছেলে তোলপাড় ফেলে দেয়। কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসাবে আইপিএল নিলামে দল পেয়েছিল সে। আইপিএল মহানিলামে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকায় বৈভবকে কিনে নিয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস।
বৈভবের উত্থানের নেপথ্যে তার বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশী। একসময় নিজে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই সময় বিসিসিআইয়ের স্বীকৃতি পায়নি বিহার। তাই স্বপ্নপূরণ হয়নি। স্বপ্নভঙ্গের পরও হার মানেননি। নিজের অপূর্ণ ইচ্ছাকে তিনি নতুন করে বুনে দেন ছেলের জীবনে। ছেলেকে গড়ে তোলার কাজে নিজেকে নিবেদন করেন তিনি। সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ পায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই জায়গা করে নেয় রাজস্থান রয়্যালসে।
বিহারের সমস্তিপুরের বৈভবের আইপিএলে উঠে আসার পথ ছিল কঠিন ও সংগ্রামমুখর। প্রতিদিন ১০০ কিলোমিটার দূরে পাটনায় গিয়ে ৬০০টি বল খেলত সে। ১৬-১৭ বছর বয়সি নেট বোলারদের জন্য খাবার জোগাতেন বাবা সঞ্জীব। এমনকী জমি বিক্রি করে খরচ চালান। মা ভোর চারটেয় উঠে খাবার তৈরি করতেন। পরিবারের ত্যাগেই বৈভবের সাফল্য সম্ভব হয়েছে। সেই বৈভবের নামে আইপিএলে দ্রুততম শতরানের রেকর্ড।
রিয়ান পরাগ: তাঁর ক্রিকেট যাত্রার নেপথ্যে রয়েছে বাবার প্রেরণা। রিয়ানের বাবা পরাগ দাসও অসমের একজন প্রাক্তন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার। অসম, রেলওয়ে এবং ইস্ট জোনের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। রিয়ানের মা মিতু বড়ুয়াও একজন ক্রীড়াবিদ ছিলেন। যা তাঁকে ক্রিকেটার হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এখন রাজস্থান রয়্যালসের অধিনায়ক হিসাবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি।
Published By: Prasenjit DuttaPosted: 06:10 PM Apr 16, 2026Updated: 06:10 PM Apr 16, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
