‘মরা’ মানুষ ফিরে এলেন বাস্তুভিটেতে! ৪৩ বছর পর। এসআইআরের আবহে নয়। পরিবারের টানে, গ্রামের টানে। কথাটা খানিকটা অদ্ভুত ঠেকছে না? কিন্তু এটাই যে বাস্তব পুরুলিয়ার আড়শার করণডি গ্রামে। যাকে ঘিরে রীতিমতো হইচই অবস্থা গ্রামে। আসলে তার পরিবার থেকে গ্রাম মনে করেছিল অনিল কুমার আর বেঁচে নেই।
১৯৮৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর শিখ দাঙ্গায় নির্ঘাত কোনও অঘটন ঘটেছিল। কারণ বর্তমানে বছর ৫৮-র অনিল কুমার কৈশোর অবস্থায় তৎকালীন বিহারের ধানবাদে একটি লেদ কারখানায় কাজ করতেন। তাই ওই ঘটনায় পরিবার তাঁকে সেখানে খুঁজতে গেলে জানতে পারে, আগের রাতেই সে পালিয়েছে। তারপর থানা-পুলিশও হয়েছে। কিন্তু ওই পরিবার অনিলকে পায়নি। তাঁরা ভেবেছিলেন নির্ঘাত ওই দাঙ্গায় কোনও অঘটন ঘটেছে।
গত শনিবার দুপুরের দিকে টোটো থেকে অনিল কুমার নামতেই তাঁর কাকিমা কুসুমকুমার চমকে ওঠেন। ঘরের ছেলে যে ফিরে এসেছে চার দশকের বেশি সময় পর। বাবা-মা, সেজো ভাই সবাই প্রয়াত। এই দীর্ঘ কয়েক বছরে প্রশাসনিক ভুলে অনিলের পদবি বদলে গিয়েছে। অনিলকুমার হয়ে গিয়েছেন অনিল কর্মকার। কিন্তু তাতে কী? পরিবারকে পেয়ে সবাই এখন উল্লসিত, খুশি। কিন্তু এতদিন কোথায় ছিলেন অনিল কুমার? মঙ্গলবার দুপুরে বাস্তুভিটের পুকুর থেকে স্নান করে এসে আওড়াচ্ছিলেন স্মৃতি।
অনিল কুমারের কথায়, ‘‘কী আর বলব? সব কিছুই মনে ছিল। পুরুলিয়া, আড়শা, করনণ্ডি। বিয়ের পর তিনবার বাড়ি যাব বলে রওনা দিয়েও ফিরে আসি। একবার হাওড়া স্টেশন থেকে এসেও ফিরে যাই। মনে হচ্ছিল বাস্তুভিটেতে আমাকে মেনে নেবে কিনা! কীভাবে বাড়ি যাব? কী হবে? কী করব? কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কতবার বাড়ির কথা স্ত্রী বলেছে। একদিন আগে এইসব বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝামেলার জন্য ঠিক করি বাস্তুভিটেতে যাবই।’’ গত শুক্রবার বিকালে হাওড়া থেকে পুরুলিয়া এক্সপ্রেসে পুরুলিয়া স্টেশনে। শনিবার গ্রামের বাড়িতে আসেন।
তাঁর জেঠতুতো দাদা বাদল কুমারের কথায়, ‘‘ঘরে অভাব থাকার কারণেই সেই সময় তাঁকে ধানবাদে নিয়ে গিয়েছিলাম। লেদ কারখানায় কাজ করার সময়ই ১৯৮৪ সালের শেষের দিকে শিখ দাঙ্গা হয়। খবর পেয়ে তাঁকে আনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, আগের রাতে সে বেরিয়ে গিয়েছে। বহু খোঁজের পরও পাইনি। ভেবেছিলাম ও হয়তো বেঁচে নেই। অনিল ফিরে আসায় যে কত ভালো লাগছে বলে বোঝাতে পারব না।’’ অনিলের খুড়তুতো ভাই সহদেব কুমার বলেন, ‘‘আমি তখন খুব ছোট। আমাকে কোলে পিঠে নিয়ে ঘুরত।’’ মকর-পার্বণ কাটিয়ে কর্মস্থল নসিবপুরে ফিরে যাবেন তিনি। সেখানেই যে তার মাছ ব্যবসা। অনিল কুমারের কথায়, ‘‘প্রশাসনিক ভুলে আমার পদবি কর্মকার হয়ে গিয়েছে। এবার ভোটার কার্ডে, আধার কার্ডে পদবি সংশোধন করে এই বাস্তুভিটেতেই বাড়ি বানাব।’’
