বিশ্বদীপ দে: শনিবাসরীয় সকালে বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া দু'টি ঘোষণা করেন। যার মধ্যে দ্বিতীয়টি- নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের সিরিজের স্কোয়াড সংক্রান্ত। নির্বাচকদের বৈঠকের পরে তা জানানো হবে বলে ঘোষণা করেন দেবজিৎ। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল তাঁর প্রথম ঘোষণাটি। তিনি জানিয়ে দেন, কলকাতা নাইট রাইডার্সকে আইপিএলের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দিতে হবে। বদলে অন্য কোনও প্লেয়ারকে চাইলে তারা নিতে পারে। এই একটি ঘোষণা যেন হঠাৎই অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে গেল। একদিকে এই উপমহাদেশে খেলার সঙ্গে রাজনীতির যে প্রবল যোগ, তা আবারও স্পষ্ট হল। পাশাপাশি স্মৃতির সরণি থেকে নেমে এল অনেক ছেঁড়া পাতা।
যার মধ্যে একটি পাতায় লাল রঙের একটা ল্যান্ডলাইন ফোন খুঁজে পাওয়া যাবেই। নিউআলিপুরের বাড়ি থেকে ওই ফোনেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের সঙ্গে সেদিন যোগাযোগ করেছিলেন এক বঙ্গসন্তান। তিনি জগমোহন ডালমিয়া। চেয়েছিলেন 'বাড়ির কাছে আরশিনগর' বাংলাদেশকে টেস্ট স্টেটাস দিতে। বাধ সেধেছিল ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। সেই সময় বিশ্বক্রিকেটে টেস্ট খেলিয়ে দেশের সংখ্যা ৯। নিয়ম ছিল অন্তত ৬টি দেশের সমর্থন পেলে তবেই অন্য কোনও দেশকে টেস্ট খেলিয়ে দেশের তকমা দেওয়া যাবে। অর্থাৎ পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে যায় ৬ বলে ৬ রান! বাকি ৬টি দেশেরই সমর্থন দরকার ছিল। ভারত বাদে বাকি ৫টি দেশ পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবোয়ের সমর্থনই সেদিন জোগাড় করতে সমর্থ হন ডালমিয়া। টেস্ট খেলার অধিকার পায় বাংলাদেশ। তার আগে আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয়ে ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল তারা। পেয়েছিল ওয়ানডে স্টেটাস। সেবারের বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে ২২ রানে হারিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানকেও ৬২ রানে পরাভূত করেছিল বাংলাদেশে। দ্বিতীয় জয়টি 'ঐতিহাসিক'। আর সেই জয়ের সুবাদেই বাংলাদেশের টেস্ট খেলার দাবিটি জোরাল হতে শুরু করেছিল। কিন্তু যতই দাবি থাক জগমোহন ডালমিয়া না থাকলে অথ মসৃণভাবে বাংলাদেশের টেস্ট খেলা হত না, একথা বলাই যায়।
মাত্র সিকি শতকেই বহু কিছু বদলে গিয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও তার বাইরে নয়। গত বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশে পরিবর্তনের হাওয়া। হাসিনা সরকার উৎখাত হয়ে যায়। সেই সঙ্গে প্রবল হয়ে ওঠে ভারতবিরোধী হাওয়া। যা ক্রমশ উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের মতো ভারতবিরোধী সংগঠনের লাগাতার প্রচার, সম্প্রতি পরপর সংখ্যালঘু হত্যা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়েছে। বাংলাদেশে বেশকিছু ভিসা কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। আর এই আবহেই আইপিএলে মুস্তাফিজুর রহমানের খেলা নিষিদ্ধ করে দিল বিসিসিআই।
প্রশ্ন উঠছে, কূটনৈতিক ঝঞ্ঝা রয়েছে বলে তার প্রভাব ক্রিকেট মাঠেও পড়বে কেন? কিন্তু একথা যাঁরা বলছেন, তাঁরা কি ভারত তথা উপমহাদেশের ক্রীড়াজগৎ ও রাজনীতিকে প্রথমবার মিশে যেতে দেখছেন? ২৬/ ১১ পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের আইপিএল খেলা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। দেড় দশক পেরিয়েও আর পরিস্থিতির বদল হয়নি। এরও আঘে ১৯৬১ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটাও সিরিজ খেলা হয়নি। আবার ১৯৮৯ সালের পর ভারতীয় ক্রিকেট দল পাকিস্তানে টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছিল ২০০৪ সালে। সেটাও বন্ধ হয়ে যায় কয়েক বছরেই। গত ১৮ বছর দুই দেশের মধ্যে কোনও টেস্ট খেলা হয়নি। ১৩ বছর হয়ে গেল শেষ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলার। বলাই বাহুল্য, দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনমনই এর নেপথ্যে।
একসময় শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও এরকম টেনশন ছিল। কিন্তু ক্রিকেটীয় সম্পর্ক অটুটই ছিল। এখন এই 'স্পটলাইট' ঘুরে গিয়েছে বাংলাদেশের দিকে। একদা ভারতের সাহায্য ছাড়া যাদের টেস্ট খেলাই হত না, আজ সেদেশেই ঘোর ভারতবিরোধী হাওয়া। কেবল মুস্তাফিজুরের সামনে আইপিএলের দরজা বন্ধ করে দেওয়াই নয়, শোনা যাচ্ছে, এই বছরই ভারতীয় দলের যে বাংলাদেশ সফরে যাওয়ার কথা ছিল, সেটাও এবার স্থগিত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতীয় বোর্ড। বিসিসিআই অবশ্য বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভারত সরকারই, তবু রোহিতদের যে বাংলাদেশে পাঠানো হবে না সেটা একপ্রকার নিশ্চিত বলেই মেনে নিচ্ছে ওয়াকিবহাল মহল।
১৯৯১ সালে বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের পর দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতে একটি তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলেছিল। সেটাই ছিল ১৯৭০ সালে ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তাদের প্রত্যাবর্তনের সিরিজ। বর্ণবাদ-মুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে আসার সময় ছিল ভারতের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এখানেও কিন্তু ক্রিকেট আর রাজনীতি মিলেমিশে গিয়েছিল।
সেই বছরেরই কথা। শিশির শিণ্ডের নেতৃত্বে শিব সেনার সমর্থক-কর্মীরা ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের পিচ খুঁড়ে দিল। উদ্দেশ্যে, সেখানে হতে চলা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হতে দেওয়া। বছর দুয়েক পরে হিরো কাপেও পাকিস্তানের আসা হয়নি। নেপথ্যে ছিলেন বাল ঠাকরে ও তাঁর শিব সেনা। সদ্য হওয়া বম্বে ব্লাস্টের কথা মনে করিয়ে তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার। শেষপর্যন্ত প্রতিযোগিতা শুরুর দিন চারেক আগে স্পষ্ট হয়ে যায় পাকিস্তান খেলবে না হিরো কাপে।
সুতরাং এই ছবি আজকের নয়। উপমহাদেশের ক্রিকেট-দাবার বোর্ডে রাজনীতির স্পর্শে ক্রিকেট বল হয়ে উঠতে পারে গোলার মতো অগ্নি উদ্রেককারী। খেলাধুলো ও রাজনীতিকে মেশানো উচিত নয়, এমন মতামতের সমান্তরালে এই ছবিও সুস্পষ্ট। সুতরাং উচিত-অনুচিত নিয়ে আলোচনার ফাঁকে এটা মেনে নিতেই হবে ক্রিকেট ময়দানে রাজনীতির এই পদচারণা চলতেই থাকবে।
