shono
Advertisement
Journalist

ককরোচ বিক্ষোভের মিছিলে কেন আক্রান্ত সংবাদমাধ্যম?

সংবাদ প্রকাশে সত্যনিষ্ঠা দস্তুর। এর জন্য মিডিয়াকে সংবিধানের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। বলতে দ্বিধা নেই, বর্তমানে সেই থাম্বরুল ভেঙে পড়েছে। কর্তব্যের আগে গুরুত্ব ‘পলিসি’-তে। সাংবাদিক সেক্ষেত্রে অসহায়।
Published By: Amit Kumar DasPosted: 01:40 PM Jul 29, 2026Updated: 01:40 PM Jul 29, 2026

সাংবাদিকদের আবার পেটানো হল ধর্মতলায়। মার তাঁরা আগেও খেয়েছেন। অনেক রক্ত ঝরেছে। শহরে রাজনৈতিক কর্মসূচি, গ্রামীণ এলাকায় সংঘর্ষ থেকে নির্বাচন ‘কভার’ করতে যাওয়া– বারবার আক্রান্ত হন রিপোর্টার ও চিত্রসাংবাদিকরা। কখনও পুলিশের লাঠি, কখনও রাজনৈতিক দলের বোমা-ইটের ঘায়ে সাংবাদিককে রক্তাক্ত হতে হয়। কিন্তু গত ২৪ জুলাই ধর্মতলায় যা ঘটল সেটা একটু অন‌্যরকম।

Advertisement

একটি ছাত্রদের রাজনৈতিক মিছিলের শেষে ধুন্ধুমার। দলীয় কর্মীরা বাধা পেয়ে পুলিশকে লক্ষ‌্য করে পাথর, জলের বোতল ছুড়ছিল। এটা খুব চেনা ছবি। আমরা জানি খানিকক্ষণ এসব চলবে। পুলিশ হয় লাঠি চালাবে, নতুবা সংযম দেখাবে। জলকামান চলবে। তারপর একসময় রণে ভঙ্গ। কিন্তু সহসা ‘টার্গেট’ হয়ে গেলেন সাংবাদিকরা! ভিড়ে মিশে থাকা এমন কিছু মুখ, যাদের দেখে বোঝায় যায় ছাত্র নয়, তারা দুষ্কৃতীদের কায়দায় বাছাই করে সাংবাদিকদের পেটাতে শুরু করল। লাঠি, জুতো, ইট দিয়ে নৃশংসভাবে মার। সঙ্গে অশ্রাব‌্য গালাগাল। বাদ গেলেন না মহিলা সাংবাদিকরাও। চিত্রগ্রাহকের ক‌্যামেরা ভাঙা হল। মোবাইল ছিনতাই হল। পকেট থেকে তুলে নেওয়া হল মানিব‌্যাগ। ধর্মতলার ঘটনা সমাজকে স্পর্শ করেছে। সাংবাদিকরা মিছিল করেছেন। প্রতিবাদ করেছেন। মুখ‌্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী হাসপাতালে গিয়ে গুরুতর আহতদের দেখে এসে চিকিৎসার যাবতীয় ব‌্যবস্থা করেছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুষ্কৃতীদের ধরছে পুলিশ। এটা খুবই ইতিবাচক দিক।

হালে পড়াশোনা ও ট্রেনিং ছাড়া প্রত্যেকে ‘সাংবাদিক’ হয়ে যাচ্ছে! রিপোর্টার, ইউটিউবার, কনটেন্ট ক্রিয়েটার– প্রত্যেকের পরিচয় ‘সাংবাদিক’। ভাল কাজ হয়তো বেশিরভাগই করছেন। কিন্তু কেউ কেউ সোশ‌াল মিডিয়ার মাধ‌্যমে সাংবাদিকতার বর্ম পরে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করছেন।

ধর্মতলার বুকে বহু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে অতীতে। এর চেয়ে অনেক বেশি রক্ত ঝরেছে গণতন্ত্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’-র। কিন্তু এমন বাছাই করে করে বহুজনের উপর হামলা আগে কখনও দেখিনি। প্রশ্নও উঠেছে, সাংবাদিকরা টার্গেট হয়ে যাচ্ছেন কেন? শুধু কলকাতা নয়, দিল্লিতেও ক’-দিন আগে একই জিনিস হয়েছে। বাছাই করে আক্রান্ত সেই সংবাদমাধ‌্যম-ই। ইদানীং ট্রেনে-বাসে সংবাদমাধ‌্যম যতটা সমালোচিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভিড়ে, তা অতীতে কখনও ছিল না। কর্পোরেট দুনিয়ার হাতে পড়ে মিডিয়া পণ্যে পরিণত হয়েছে অনেক দিন আগেই। অধিকাংশ সংবাদমাধ‌্যম চলে ব‌্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে। সংবাদ প্রকাশে সত‌্যনিষ্ঠা দস্তুর। এর জন‌্য মিডিয়াকে সংবিধানের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। বলতে দ্বিধা নেই, বর্তমানে সেই থাম্বরুল ভেঙে পড়েছে। কর্তব্যের আগে গুরুত্ব ‘পলিসি’-তে। সাংবাদিক সেক্ষেত্রে অসহায়। তাকে চাকরি করতে গেলে পলিসি অনুযায়ী কাজ করতে হয়। স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় স্তরের সংবাদ মাধ‌্যম এই অভিযোগ বিদ্ধ। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। অভিযোগ মূলত একই, সত‌্য খবর চেপে যাওয়া। অথবা কাউকে খুশি করতে ইচ্ছামতো অ‌্যাঙ্গেল দিয়ে খবর তৈরি। মজা হচ্ছে– এখন সোশ‌াল মিডিয়ার যুগ। সিসিটিভির যুগ। চাইলেই কোনও কিছুই চেপে রাখা যায় না। খবর চেপে দিলে অথবা সত্যের অপলাপ করলে ধরা পড়ে যেতে বাধ‌্য। ঠিক এই জন‌্যই মিডিয়া মানুষের মনে বিশ্বাস হারাচ্ছে। একটা সময় ছিল মিডিয়া আক্রান্ত হলে সাধারণ মানুষের মনে প্রভাব পড়ত। তার অভিঘাত বহু দূর পর্যন্ত প্রসারিত হত। কিন্তু সেই সাধারণ মানুষের মনে এখন ‘বেশ হয়েছে’ মনোভাব!

সংবাদমাধ‌্যমে হরেক খবরের জন‌্য নানা সাংবাদিক থাকেন। তবে রাজনৈতিক সংবাদদাতা ও ইনসিডেন্ট রিপোর্টারকে রণাঙ্গনে থাকতে হয় বেশি। হামলার শিকার মূলত তাঁরা-ই হন। সাংবাদিককে যেতে হয় বিক্ষোভ, সংঘর্ষের ভিতর। সেই সময় আক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। যুদ্ধ ‘কভার’ করতে গিয়েও বহু সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সবটাই পেশাগত সমস‌্যা। এড়ানোর উপায় নেই। তিন দশকের বেশি সময় আমি সাংবাদিকতা করছি। অসংখ‌্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সংঘর্ষের মধ্যে পড়েছি। ১৯৯৭ সালে তপসিয়ায় গুলি-বোমার মধ্যে পড়ে কোনওক্রমে প্রাণ রক্ষা করেছিলাম। ২০০০ সালের পুরভোটে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে পায়ের সামনে বোমা পড়ে রক্তাক্ত হই। ছিটকে পড়ি। একটু এদিক-ওদিক হলে মাথায় ফাটত বোমা। মাওবাদীদের গুলিগোলার মধ্যে জঙ্গলমহলে তো গিয়েইছি। ছত্তিশগড়ের বস্তারের ভয়ংকর জঙ্গলে গিয়েছি বিধানসভা নির্বাচন ‘বয়কট’ কেমন হচ্ছে দেখতে। রাইফেলধারীরা স্পষ্ট বলেছে, ‘ফিরে যান। এখানে কোনও সরকার নেই। আইন নেই।’ ২০০১ সালে গড়বেতার ছোট আঙারিয়ার হত‌্যাকাণ্ড এক ভয়াবহ অধ‌্যায়। ৫ জানুয়ারি সকাল থেকে আসছিল নানা খবর। কিন্তু রাত পর্যন্ত জানাই গেল না কী ঘটেছে!

সংবাদ প্রকাশে সত‌্যনিষ্ঠা দস্তুর। এর জন‌্য মিডিয়াকে সংবিধানের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। বলতে দ্বিধা নেই, বর্তমানে সেই থাম্বরুল ভেঙে পড়েছে। কর্তব্যের আগে গুরুত্ব ‘পলিসি’-তে। সাংবাদিক সেক্ষেত্রে অসহায়।

‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর তৎকালীন কার্যনির্বাহী সম্পাদক অঞ্জন বসুর নির্দেশে আমি রওনা হলাম মধ‌্যরাতে। সেদিন ছিল সিপিএমের ডাকে বাংলা বন্‌ধ। সারা দিন হাওড়া স্টেশন থেকে কোনও ট্রেন ছাড়েনি। ধূ ধূ প্ল‌্যাটফর্মে চক্রধরপুর প‌্যাসেঞ্জারে সওয়ারি হলাম। ভোর রাতে গড়বেতায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেল ট্রেন। তখনও আলো ফোটেনি। তীব্র শীত। স্টেশনের ধারে একটই আলো জ্বলছিল। সেটি লজ। সেখানে উঠে কিছুক্ষণ পরেই রওনা হলাম স্পটের দিকে। কোনও গাড়ি যেতে চাইছিল না। অবেশেষে বেশি ভাড়া দিয়ে একজনকে পেলাম। শিলাবতী নদী পেরিয়ে ভালুকবাসা জঙ্গলকে একদিকে রেখে দুর্গম সেই গণ্ডগ্রামে যখন পৌঁছেছিলাম– বুকের উপর সরাসরি রিভলবার ধরল এক ক‌্যাডার। প্রশ্ন, কেন এসেছি? গুলি চালিয়ে দেহ গুম করে দিতে পারত। হয়তো ড্রাইভার সঙ্গে ছিল বলেই কপালজোরে বেঁচে যাই। ‘নাটের গুরু’ বক্তার মণ্ডলকে পেয়েছিলাম সেখানেই। আমাদের সমসাময়িক সাংবাদিকদের কেশপুর, গড়বেতা, চমকাইতলা, শিহর, পিংলা ডেবরার সন্ত্রাসমুখর দিনগুলির অথবা নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের অধ‌্যায় থেকে বেলপাহাড়ি-সহ জঙ্গলমহলে ভয়ংকর দিনগুলিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা প্রত্যেকের কম-বেশি আছে। সবাই কখনও না কখনও রক্তাক্ত হয়েছে।

কেশপুর পুনর্দখলের সময় একেবারে ‘যুদ্ধ’-র মুখে পড়েছিলাম। ধানের খেত ধরে দু’-দিকে দাঁড়িয়ে সশস্ত্র দু’টি পক্ষ। বোমা-গুলি চলছে অবাধে। পুলিশ ঢুকতে ভয় পাচ্ছে গ্রামে। দেখতে এসেছিলেন সাংসদ বিক্রম সরকার। কালবিলম্ব না করে উল্টো রাস্তা দিয়ে পালালেন। জীবনে যতগুলি বড় অ‌্যাসাইনমেন্ট করেছি– তার মধ্যে সবচেয়ে আগের দিকে রাখতে হবে ২০০২ সালে দাঙ্গার পর গুজরাতে বিধানসভা নির্বাচন ‘কভার’ করা। ওই সফরে মাহেসনার ওয়াটনগর গ্রামে তৎকালীন গুজরাতের মুখ‌্যমন্ত্রী তথা দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পৈতৃক ভিটেয় গিয়ে তাঁর মা হীরাবেনের দেখা পেয়েছিলাম। তাঁর জীবনের প্রথম সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ। ওই সফরে ভোটের দিন ছিলাম গোধরায়। ভোট তো নয়, দুই গোষ্ঠী চোখরাঙানি। ফুটন্ত সেই মাটিতে যে কোনও সময় সংঘর্ষ বাধবে। তবু সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়েছিল।

সাংবাদিকতার আবহটাই বদলে গিয়েছে। এখন পর্যাপ্ত পড়াশোনা ও ট্রেনিং ছাড়া প্রত্যেকে ‘সাংবাদিক’ হয়ে যাচ্ছে! ফলে পেশাটাই সংকটে।

মাত্র ক’টি উদাহরণ দিলাম। আমার সহকর্মী সাংবাদিক বন্ধুদের আরও অনেক শিউরে ওঠার মতো অভিজ্ঞতা আছে। রক্ত ঝরেছে, প্রাণসংশয় হয়েছে। তবু আমরা কেউ প্রফেশন ছেড়ে চলে যাইনি। প্রয়াত বিশিষ্ট সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত মনে করতেন, সাংবাদিকের মার খাওয়া কোনও ‘খবর’ নয়। এটা হতেই পারে। তা নিয়ে হইচই করা, অথবা ‘খবর’ করার দরকার নেই। সাংবাদিককে পাঠানো হয় ‘খবর হতে’ নয়, ‘খবর সংগ্রহ করতে’। হয়তো সেই সময় তিনি ঠিক বলেছিলেন।

কিন্তু এখনকার দুনিয়ায় সেই কথার বাস্তবতা অন‌্যমুখী। কারণ, সাংবাদিকতার আবহটাই বদলে গিয়েছে। এখন পর্যাপ্ত পড়াশোনা ও ট্রেনিং ছাড়া প্রত্যেকে ‘সাংবাদিক’ হয়ে যাচ্ছে! ফলে পেশাটাই সংকটে। রিপোর্টার, ইউটিউবার, কনটেন্ট ক্রিয়েটার: সব মিলেমিশে গিয়েছে। সবার পরিচয় ‘সাংবাদিক’। ভাল কাজ হয়তো বেশিরভাগই করছেন। কিন্তু কেউ কেউ সোশ‌াল মিডিয়ার মাধ‌্যমে সাংবাদিকতার বর্ম পরে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করছেন। এই প্রবণতা যত বাড়বে, যত ইলেকট্রনিক চ‌্যানেলগুলি ‘পলিসিমুখী’ হয়ে পড়বে, তত সংবাদমাধ‌্যম সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস কমবে। মূল‌্য দিতে হবে ফিল্ডে কাজ করা সাধারণ সাংবাদিকদের। মিডিয়ার বিবর্তন স্বাভাবিক। অফসেট প্রেসের যুগ থেকে সোশ‌াল মিডিয়া– এক যুগোপযোগী উত্তরণ। কিন্তু সাংবাদিকের নিরাপত্তার দিকটি উপেক্ষিতই। আগে যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত ঝরত, এখন সরাসরি আক্রমণ শুরু। ঘরে-বাইরে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement