shono
Advertisement
Donald Trump

ইজরায়েল লবির চাপে ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প, ‘নো কিংস’ দাবিতে পথে ৯০ লক্ষ আমেরিকান

কয়েক দিন আগে আমেরিকায় ‘নো কিংস’ মানে ‘গণতন্ত্রে কোনও রাজা চাই না’ প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছে। বিভিন্ন শহরে প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার দাবিতে পথে নেমেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রতিবাদকে বামপন্থীদের প্রচার বলে দেখানোর চেষ্টা করলেও মিছিলে শামিল হয়েছিলেন দক্ষিণপন্থীরাও। ইজরায়েল লবির চাপে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে জড়িয়েছেন, এ মত স্পষ্ট।
Published By: Kishore GhoshPosted: 09:48 PM Apr 07, 2026Updated: 09:48 PM Apr 07, 2026

মধ্যপ্রাচ্যে কি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘটবে? এ প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা সারা বিশ্বের। পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের দেওয়া একটি সন্ধিপ্রস্তাব আমেরিকা ও ইরানের কাছে পৌঁছেছে বলে খবর। এই প্রস্তাবে আপাতত ৪৫ দিন যুদ্ধ বন্ধ রেখে হরমুজ প্রণালী খোলার কথা বলা হয়েছে। বস্তুত, এই হরমুজ প্রণালী এবারের যুদ্ধের ‘গেমচেঞ্জার’। বিশ্বের চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজে করে বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এই ২০ শতাংশ তেলের সরবরাহ বিশ্ব অর্থনীতিতে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রণালীটি বন্ধ হওয়ায় সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই আশঙ্কার কথা অবশ‌্য ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিশেষজ্ঞরা জানাতে শুরু করেছিলেন। তবুও অবাঞ্ছিত যুদ্ধটি এড়ানো যায়নি আমেরিকার বিদেশনীতি প্রবলভাবে ইজরায়েলের দিকে ঝুঁকে থাকায়।

Advertisement

বাইবেলের দোহাই দিয়ে শাসক দলগুলি জায়নবাদীদের দিকে ঝুঁকে থাকায় যে অাখেরে মার্কিন নাগরিকদের স্বার্থই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে– সে বক্তব‌্য এবার অামেরিকায় গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। কয়েক দিন অাগে অামেরিকায় ‘নো কিংস’ মানে ‘গণতন্ত্রে কোনও রাজা চাই না’ প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছে। এর অাগেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘নো কিংস’ অান্দোলন হয়েছিল, কিন্তু এবারেরটা ছিল ঐতিহাসিক। অামেরিকার বিভিন্ন শহরের প্রতিবাদ মিলিয়ে প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার দাবিতে এবার পথে নেমেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রতিবাদকে বামপন্থীদের প্রচার বলে দেখানোর চেষ্টা করলেও মিছিলে শামিল হয়েছিলেন ঘোষিত দক্ষিণপন্থীরাও। একাধিক সুপরিচিত দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ‌‌্যমে বলতে শুরু করেছেন যে, জায়নবাদের এই দায় অামেরিকার পক্ষে বয়ে চলা ক্রমশ ব‌্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ, অামেরিকায় বামপন্থী ও ডানপন্থী উভয় শক্তিই এবার ইজরায়েলপন্থী বিদেশনীতির বিরুদ্ধে সরব হতে শুরু করেছে। যা যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে চাপ বাড়িয়েছে ট্রাম্পের উপর। ‘নো কিংস’ অান্দোলন থেকে লক্ষ লক্ষ মার্কিন নাগরিক এই বার্তাই দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা অার প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র যুদ্ধ ক্ষমতা মেনে নিতে রাজি নয়। ট্রাম্প যতই দাবি করুন যে, ‘তিনি নিজেকে রাজা বলে মনে করেন না’, এবারের ‘নো কিংস’ অান্দোলনের মূল স্লোগানই ছিল– ‘রেজিম চেঞ্জ বিগিন্‌স অ‌্যাট হোম’। অর্থাৎ, ইরানে শাসক পরিবর্তনের অাগে অাপামর মার্কিনিরা চাইছে ট্রাম্পের বিদায় ঘটুক।

ট্রাম্পের যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে কয়েক দিন অাগেই অামেরিকার জাতীয় সন্ত্রাসদমন কেন্দ্রের প্রধান জো কেন্ট পদত‌্যাগ করেছেন। পদত‌্যাগ করার সময় তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, ইরানের দিক থেকে অাপাতত অামেরিকার সামনে কোনও বিপদ ছিল না। অামেরিকা এই যুদ্ধে জড়িয়েছে স্রেফ মার্কিন প্রশাসনের ভিতরে থাকা ইজরায়েল লবির চাপে। একদা ট্রাম্প-সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও লিখতে শুরু করেছেন, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে অামেরিকাকে যুদ্ধে নামিয়েছেন। অারব ভূখণ্ডের একটি বড় অংশ দখল করে বৃহত্তর ইজরায়েল গঠনের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চাইছেন নেতানিয়াহু। ইরানকে দখল করতে পারলে তা সম্ভব। নেতানিয়াহু জানেন, ট্রাম্পের অামলে এটা করে ফেলাই শ্রেয়। এটাই কার্যত শেষ সুযোগ। ভবিষ‌্যতে কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এই কাজে নামানো সম্ভব নাও হতে পারে।

বাইবেলের দোহাই দিয়ে শাসক দলগুলি জায়নবাদীদের দিকে ঝুঁকে থাকায় যে অাখেরে মার্কিন নাগরিকদের স্বার্থই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে– সে বক্তব‌্য এবার আমেরিকায় গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। কয়েক দিন আগে আমেরিকায় ‘নো কিংস’ মানে ‘গণতন্ত্রে কোনও রাজা চাই না’ প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছে।

সম্ভবত যুদ্ধে নেমে পড়ার অাগে ট্রাম্পও বুঝতে পারেননি, দেশের ভিতর থেকে এইভাবে প্রতিরোধ অাসবে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র‌্যাট– অামেরিকার দু’টি দলই বরাবর ইজরায়েলপন্থী বিদেশনীতি নিয়ে চলেছে। ইরান যুদ্ধেই এই ব‌্যতিক্রম প্রত‌্যক্ষ করা যাচ্ছে। এর মূল কারণ যে অর্থনৈতিক, তা বলা বাহুল‌্য। অামেরিকার রক্ষণশীলরাও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেছে। ট্রাম্পের উগ্র জাতীয়তাবাদী ‘মেক অামেরিকা গ্রেট এগেইন’ তথা ‘মাগা’ নীতির বিরোধিতা শোনা গিয়েছে ‘নো কিংস’ মিছিল থেকে। মার্কিন জনগণ এই প্রথম রাজনৈতিক বিরোধ দূরে রেখে যুদ্ধের বদলে ‘অামেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তাছাড়া, এই যুদ্ধের খরচও বিপুল। ইরানের দিকে রোজ অামেরিকা যে শয়ে-শয়ে প‌্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে তার এক-একটার দাম ৩০ থেকে ৬০ লক্ষ মার্কিন ডলার। যে ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরানের কয়েক হাজার ডলারের ‘শাহেদ ড্রোন’ প্রতিরোধ করছে অামেরিকা, তার দাম প্রায় ১২০ লক্ষ ডলার।

এই যুদ্ধ হল অপ্রতিসম যুদ্ধ। ইরান অনেক কম খরচে যুদ্ধ করছে। অামেরিকার যুদ্ধের খরচ বিপুল। ইরানের সস্তার ড্রোন প্রতিরোধ করতে অামেরিকার লক্ষ লক্ষ ডলার রোজ গলে যাচ্ছে। প্রাথমিক হিসাবে অামেরিকা প্রতিদিন ১০০ কোটি ডলার খরচ করছে। যুদ্ধ ৩৮ দিন অতিক্রান্ত। ইরানের হারের কোনও লক্ষণ নেই। এই ধরনের যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে ইরানি সেনাবাহিনি বহু বছর ধরে তাদের বিশাল মরুপ্রান্তরে মাটির তলায় পরিকাঠামো নির্মাণ করেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ইরানি সেনারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে অাবার মাটির তলায় লুকিয়ে যাচ্ছে। ফল সামরিক ক্ষয়ক্ষতিও তাদের তুলনায় কম। বরং বিধ্বস্ত ইজরায়েলের বিখ‌্যাত ‘অায়রন ডোম’ নামক প্রতিরোধ ব‌্যবস্থা। মধ‌্যপ্রাচে‌্য অামেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব‌্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত। অাগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষে‌্য অাঘাত করতে সক্ষম হচ্ছে। অামেরিকার দু’-দু’টি বহুমূল‌্য ‘এফ১৫’ এবং একটি ‘এ১০’ যুদ্ধবিমানকেও অল্প সময়ের ব‌্যবধানে ধ্বংস হতে দেখা গেল।

এই যুদ্ধ হল অপ্রতিসম যুদ্ধ। ইরান অনেক কম খরচে যুদ্ধ করছে। আমেরিকার যুদ্ধের খরচ বিপুল। ইরানের সস্তার ড্রোন প্রতিরোধ করতে অামেরিকার লক্ষ লক্ষ ডলার রোজ গলে যাচ্ছে। প্রাথমিক হিসাবে আমেরিকা প্রতিদিন ১০০ কোটি ডলার খরচ করছে।

একদিকে পাহাড় প্রমাণ যুদ্ধের খরচ, এবং অন‌্যদিকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে যাওয়া ‘পেট্রোডলার’ টান মারতে শুরু করেছে মার্কিন অর্থনীতিকে। সাতের দশকে যবে থেকে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ডলারে ঘোষিত হতে শুরু করেছে, তবে থেকে ‘পেট্রোডলার’-এর রমরমা। বিশ্বে জ্বালানি তেল কিনতে ডলার লাগে। তাই জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়লে ডলারেরও চাহিদা বাড়ে। জ্বালানি তেলের বাণিজ‌্য ধাক্কা খেলে ডলারও ধাক্কা খায়। ডলারের চাহিদা ও মান কমে। এবার দেখা যাচ্ছে যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বহু দেশ ডলার এড়িয়ে সরাসরি নিজের মুদ্রায় জ্বালানি সংগ্রহে ব‌্যস্ত। ভারতও চেষ্টা করছে টাকা দিয়ে সরাসরি ইরানের তেল কিনতে। রাশিয়া তেল বিক্রি করছে রুবলে। ‘পেট্রোডলার’-এর অাধিপত‌্য খর্ব হওয়া কত দিন মানবে মার্কিন নাগরিকরা? এর সঙ্গে রয়েছে মূল‌্যবৃদ্ধির চাপ। ফলে যুদ্ধ থেকে পিছু হটতেই হবে ট্রাম্পকে।

কিন্তু নেতানিয়াহু কি ট্রাম্পকে পিছু হটতে দেবেন? ইজরায়েল লবি ‘হোয়াইট হাউস’-কে অারও কত দিন বশে রাখতে পারবে? এটাই এ সময়ের সবচেয়ে দামি প্রশ্ন। আর, এর উত্তরের মধে‌্যই নিহিত রয়েছে মধ‌্যপ্রাচে‌্যর বর্তমান যুদ্ধের ভবিষ‌্যৎ।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement