আরটিআই আইনের (RTI Act) ধারা পরিবর্তন ‘সাংবিধানিক সংবেদনশীল’! জনস্বার্থে প্রয়োজন হলেও, এখন সবই ‘ব্যক্তিগত’। বিতর্ক তুঙ্গে।
ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম শক্তি নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার। যা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল ২০০৫ সালের তথ্যের অধিকার আইনে। কিন্তু ‘ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন আইন ২০২৩’-এর কারণে আরটিআই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংশোধন হতেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি এই সংশোধনীকে ঘিরে একাধিক আবেদন শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিকে ‘সাংবিধানিক সংবেদনশীল’ হিসাবে স্বীকার করে মামলাটিকে সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠিয়ে দিয়েছে।
প্রধান বিচারপতির মন্তব্য– ‘ব্যক্তিগত তথ্য’ বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা আদালতকেই নির্ধারণ করতে হতে পারে। আর এতেই স্পষ্ট যে, বিতর্কটি কতটা গভীর প্রশ্নের উদ্রেক করছে। বস্তুত, মূল সমস্যার সূত্রপাত আরটিআই আইনের ৮(১)(জে) ধারার সংশোধনে। এই ধারায় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম ছিল– ‘বৃহত্তর জনস্বার্থ’। অর্থাৎ, জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা যেত। এই নীতিই ছিল আরটিআই আইনের প্রাণ। কিন্তু সংশোধনীতে সেই ব্যাপারটি পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন ‘ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত’ যে কোনও তথ্যই প্রকাশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের ফল সুদূরপ্রসারী। সরকারি আধিকারিকদের কার্যকলাপ, সরকারি ক্রয়-বিক্রয়, পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট বা জনসাধারণের অর্থব্যয়ের তথ্য, সবকিছুই ‘ব্যক্তিগত তথ্য’ বলে দেখিয়ে আটকে দেওয়া সম্ভব। এর ফলে স্বচ্ছতার পথটি অনেকটাই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’ নামে একটি নাগরিক অধিকার সংস্থা এখানেই দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছে। একদিকে ডিপিডিপি আইনের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য তার সম্মতি ছাড়াই ব্যবহার করতে পারে, অন্যদিকে নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে তথ্য চাইতে গেলে একই যুক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। ফলে এক অদ্ভুত অসাম্য তৈরি হচ্ছে, রাষ্ট্র নাগরিকের উপর নজরদারি চালাতে পারবে, কিন্তু নাগরিক রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে পারবে না। এই সংশোধনীর প্রভাব পড়বে সংবাদমাধ্যমের উপরও।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ, ডিপিডিপি আইনের আওতায় তথ্য সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকদের উপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ হতে পারে। এমনকী আইন ভঙ্গের অভিযোগে ২৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। এতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কার্যত খর্ব হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাহলে গোপনীয়তার নামে কি স্বচ্ছতার পথ বন্ধ করা হচ্ছে? গোপনীয়তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যেন কখনওই জবাবদিহিতার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। সংবিধান বেঞ্চের সামনে এটাই চ্যালেঞ্জ যে, এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ, একটি সুস্থ গণতন্ত্রে রাষ্ট্র যেমন নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে, তেমনই নাগরিকও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার অধিকার রাখে। আর সেই অধিকার রক্ষাই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি।
