shono
Advertisement
Delimitation

ডিলিমিটেশন কেবল সীমানা পুনর্নির্ধারণ নয়, ভারতের ফেডারেল কাঠামোর পরীক্ষা

নারী-প্রতিনিধিত্ব নিয়ে শুরু হওয়া এই বিতর্ক দ্রুতই আরও জটিল এক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে, তা হল, ‘ডিলিমিটেশন’। এবং তারই সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন, দক্ষিণী রাজ্যগুলি যদি কোনওভাবে বিপাকে পড়ে, তাহলে তা ‘অভূতপূর্ব আন্দোলন’-এর জন্ম দেবে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 03:39 PM Apr 24, 2026Updated: 05:38 PM Apr 24, 2026

ডিলিমিটেশন (Delimitation) কেবল সীমানা পুনর্নির্ধারণ নয়, এটি ভারতের ফেডারেল কাঠামোর বড় পরীক্ষাও। ভুলভাবে পরিচালিত হলে আঞ্চলিক বিভাজনকে তীব্রতর করতে পারে। লিখছেন রাজদীপ সরদেশাই

Advertisement

নরেন্দ্র মোদির মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ২০২৩ সালে বিপুল আড়ম্বরের
সঙ্গে পাস হওয়া নারী সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নের প্রশ্নটি এই মুহূর্তে আবার সামনে আনার নেপথ্যে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্দেশ্য কী– তা স্পষ্ট নয়। সবটাই কি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন‌্য? না কি পশ্চিম এশিয়ার অস্থির প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক উদ্বেগ থেকে দৃষ্টি সরানোর প্রচেষ্টা? না কি ‘নারী শক্তি’-র প্রবক্তা রূপে নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি পুনর্নির্মাণের এটি একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ?

উদ্দেশ্য যাই হোক, এর রাজনৈতিক অভিঘাত গভীর। নারী-প্রতিনিধিত্ব নিয়ে শুরু হওয়া এই বিতর্ক দ্রুতই আরও জটিল এক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে, তা হল, ‘ডিলিমিটেশন’। এবং তারই সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের আশঙ্কা। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন, দক্ষিণী রাজ্যগুলি যদি কোনওভাবে বিপাকে পড়ে, তাহলে তা ‘অভূতপূর্ব আন্দোলন’-এর জন্ম দেবে। তামিলনাড়ুর মুখ‌্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট‌্যালিন, যিনি এখন নির্বাচনী লড়াইয়ের মধ্যে রয়েছেন– তিনিও একই সুর তুলেছেন।

সুতরাং প্রশ্ন উঠতে বাধ‌্য– এটা কি নিছক রাজনৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা? না কি গভীর কাঠামোগত উদ্বেগের প্রতিফলন? অস্বস্তিকর হলেও উত্তর হল: দুই-ই। সংখ্যার দিক থেকে দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার। গত পাঁচ দশকে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি দক্ষিণের তুলনায় অনেক বেশি। তামিলনাড়ু, কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্নাটক অনেক আগে থেকেই জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। যদি সংবিধান অনুযায়ী, জনসংখ্যার ভিত্তিতেই নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়, তবে ২০২৬ সালের জনগণনার পর লোকসভায় দক্ষিণের আসন সংখ্যা অনিবার্যভাবে কমে যাবে।

এটি রাজনৈতিক ভাষ্য নয়, জনতাত্ত্বিক বাস্তবতা। তবে মনে রাখতে হবে, ‘ডিলিমিটেশন’ বিষয়টিও অবৈধ নয়। এটি গণতান্ত্রিক নীতির উপর ভিত্তি করে– প্রত্যেক নাগরিকের সমান প্রতিনিধিত্ব। সংসদীয় আসন সংখ্যা স্থগিত রাখা একটি সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে, তবে তা স্থায়ী সমাধান নয়। জনসংখ্যা পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিনিধিত্বের সামঞ্জস্য আনা অনিবার্য। আসল সমস্যা অন্যত্র– রাজনীতি সমন্বয় ও আস্থার ঘাটতি। যখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সমস্ত রাজ্যে সমানভাবে ৫০ শতাংশ আসন বাড়ানোর প্রস্তাব দেন, তখন সেটি একটি সম্ভাব্য সমঝোতার ভিত্তি হতে পারত– এমন একটি সম্প্রসারণ, যাতে কোনও অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

মনে রাখতে হবে, ‘ডিলিমিটেশন’ বিষয়টিও অবৈধ নয়। এটি গণতান্ত্রিক নীতির উপর ভিত্তি করে– প্রত্যেক নাগরিকের সমান প্রতিনিধিত্ব। সংসদীয় আসন সংখ্যা স্থগিত রাখা একটি সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে, তবে তা স্থায়ী সমাধান নয়। জনসংখ্যা পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিনিধিত্বের সামঞ্জস্য আনা অনিবার্য।

কিন্তু প্রস্তাবটি এসেছে দেরিতে, এবং তা স্বতঃস্ফূর্ত নয়, বরং প্রতিক্রিয়াশীল। অথচ, এ ধরনের বৃহৎ সংস্কারে প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে আগাম আলোচনার মাধ্যমে আস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এখানেই মোদি সরকার সময় নির্বাচনে ভুল হয়েছে। যদি আগে থেকেই সব দল ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করা হত, তবে আস্থা ও অংশীদারিত্ব তৈরি করা সম্ভব ছিল। তার বদলে এখন যে-ধারণা তৈরি হয়েছে–সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া, পরে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। ফেডারেল কাঠামোয় ধারণাই শক্তি। আর, এই একতরফা সিদ্ধান্তের আশঙ্কাই দক্ষিণে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে– সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর কি তবে ধীরে ধীরে জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করবে?

তবে এটিকে নিছক ‘উত্তর বনাম দক্ষিণ’ দ্বন্দ্ব হিসাবে দেখাও ভুল। দক্ষিণ রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণের আশঙ্কা করলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। দেশের জিডিপি, রফতানি ও কর-আদায়ে দক্ষিণী রাজ্যগুলির অবদান অনেকাংশে বেশি। বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদের মতো শহর বৈশ্বিক উদ্ভাবন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংসদ জনসংখ্যার প্রতিফলন হলে, অর্থনীতি ক্রমশ কর্মদক্ষতার প্রতিফলন– এবং সেখানে দক্ষিণ উত্তরের চেয়ে এগিয়ে। সামাজিক সূচকেও একই চিত্র– শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানব উন্নয়নে দক্ষিণ এগিয়ে। ফলে, এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে– যেখানে সাফল্যের নিরিখেই রাজনৈতিক ওজন কমার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

তবুও ভারতের বাস্তব এত সহজ নয়। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংহতি এমনভাবে বাড়ছে, যার আলোচনা রাজনীতির ময়দানে প্রায়ই উপেক্ষিত। ভেবে দেখুন, রাঁচির ভূমিপুত্র মহেন্দ্র সিং ধোনির জন্য ‘চেন্নাই সুপার কিংস’-এর অনুগামীদের কী মারাত্মক ক্রেজ। অথবা ‘আরআরআর’-এর সর্বভারতীয় সাফল্য, যা ভাষার সীমা ছাড়িয়ে এক যৌথ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত। এর সঙ্গে যোগ করুন অভিবাসন– উত্তরের মানুষ দক্ষিণের প্রযুক্তি শহরে, দক্ষিণের পেশাজীবীরা উত্তরে– সব মিলিয়ে এক আন্তঃসংযুক্ত ভারতের ছবি ফুটে ওঠে। এও ঠিক সাংস্কৃতিক সংহতি রাজনৈতিক আস্থার ‘বিকল্প’ নয়। বিজেপি দক্ষিণে নিজেদের প্রসার ঘটাতে মরিয়া– নির্বাচনী ও সাংগঠনিকভাবে। কিন্তু প্রতীকী কোনও কিছুই তা পোশাক-পরিচ্ছদ সংক্রান্ত হোক বা আলংকারিক– তা আস্থার ঘাটতি পূরণ করতে পারে না।
নরেন্দ্র মোদির গুরুভায়ুর মন্দিরে ঐতিহ‌্যবাহী ‘মুন্ড’ পরে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী ফোটো-অপ, কিন্তু তা গভীরে নিহিত উদ্বেগ দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংহতি এমনভাবে বাড়ছে, যার আলোচনা রাজনীতির ময়দানে প্রায়ই উপেক্ষিত। ভেবে দেখুন, রাঁচির ভূমিপুত্র মহেন্দ্র সিং ধোনির জন্য ‘চেন্নাই সুপার কিংস’-এর অনুগামীদের কী মারাত্মক ক্রেজ।

কারণ, ডিলিমিটেশন নিয়ে উদ্বেগ কেবল আসন সংখ্যার নয়– এটি কণ্ঠস্বরের প্রশ্ন। যে অঞ্চলগুলি দেশের উন্নয়নে বড় অবদান রেখেছে, তারা ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সমান প্রভাব বজায় রাখতে পারবে কি না– সে প্রশ্নই মূল। এর উত্তর শুধু আশ্বাস দিয়ে মেটানো যাবে না, প্রয়োজন নতুন চিন্তাধারার। ভারত কি এমন কোনও মিশ্র প্রতিনিধিত্বের মডেল গড়ে তুলতে পারে, যা জনসংখ্যার ভিত্তিতে দাঁড়িয়েও সীমিতভাবে কর্মদক্ষতা, কর-অবদান বা মানব উন্নয়নকে
স্বীকৃতি দেয়?

এ বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে। পরিশেষে বলব, ডিলিমিটেশন কেবল সীমানা পুনর্নির্ধারণ নয়– এটি ভারতের ফেডারেল কাঠামোর এক বড় পরীক্ষাও। ভুলভাবে পরিচালিত হলে এটি আঞ্চলিক বিভাজনকে আরও তীব্র করতে পারে; আবার সংবেদনশীলভাবে সামলাতে পারলে এটি সংহতিকে আরও মজবুত করতে পারে।
নারী সংরক্ষণ বিতর্ক হয়তো কেবল সূচনা। কিন্তু এটি ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে এক গভীর উদ্বেগকে সামনে এনেছে। এটি কেবল অঙ্কের হিসাব নয়– আস্থার প্রশ্ন। আর, আস্থা একবার ভেঙে গেলে, কোনও গণিতই সেই ভাঙন সামলাতে পারে না।

পুনশ্চ: রেবন্ত রেড্ডি একটি ‘বিকল্প’ প্রস্তাব দিয়েছেন, সংসদে নয়, বরং রাজ্য ও স্থানীয় স্তরে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হোক। তাঁর মতে, উন্নত প্রশাসনের জন্য আরও বেশি বিধায়ক ও কাউন্সিলর প্রয়োজন, সংসদ সদস্য নয়। এ ধারণাটি অন্তত আলোচনার দাবি রাখে, কারণ এটি কম বিভাজনমূলক একটি পথ হতে পারে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement