shono
Advertisement
PM Modi

‘জেন জি’-দের ক্ষমাশীলতার বার্তা কি প্রধানমন্ত্রীর ‘মাস্টারস্ট্রোক’?

মোদির ভিডিও-বার্তার কৌশল ‘জেন জি’-কে নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকটা কার্যকরী বলে ধারণা বহু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরও।
Published By: Biswadip DeyPosted: 01:44 PM Aug 04, 2026Updated: 01:47 PM Aug 04, 2026

যন্তর মন্তর আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ‘জেন জি’-দের ক্ষোভ ও হতাশা। আর এই হতাশার মূলে বেকারত্ব। নরেন্দ্র মোদি এটাকেই তাঁর ভিডিও-বার্তায় ‘সমাজের ক্ষোভ ও হতাশা’ বলে ব‌্যাখ‌্যা করেছেন। এমনকী ক্ষমা করেছেন নয়ডার কিশোরীকেও। এই ক্ষমাশীলতার বার্তা কি প্রধানমন্ত্রীর ‘মাস্টারস্ট্রোক’?  

Advertisement

দাঁতের আঘাতে জিভ রক্তাক্ত হলে আমরা দাঁত ভেঙে ফেলি না। কারণ দাঁতও আমার, জিভও আমার। নয়ডার কিশোরীকে ক্ষমা করতে গিয়ে এই ঐতিহাসিক মন্তব‌্যটি করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নয়ডার অভিযুক্তকে কিশোরীই বলা উচিত, কারণ, পড়ুয়াটির মা দাবি করেছেন তাঁর কন‌্যার বয়স ২৫ নয়, মাত্র ১৫। পুলিশ ‘এফআইআর’-এ সম্ভবত ইচ্ছা করে বয়স ২৫ দেখিয়েছে। পড়ুয়ার মায়ের দাবিই ‘সত্যি’ বলে ধরে নিতে হবে এবং তাহলেও সে যে ‘জেন জি’– সেটা মেনে নিতে হবে। কিশোরী পড়ুয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ– যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থলে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটুকথা বলা। প্রধানমন্ত্রী নিজে জানিয়েছেন, ওই পড়ুয়া শুধু তাঁকে নয়, তাঁর প্রয়াত মাকেও অশালীন শব্দে বিদ্ধ করেছে। ‘এফআইআর’ হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভিডিও-বার্তায় মোদি ওই কিশোরীকে ক্ষমা করে দিয়ে অবশ‌্যই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা নিয়ে দেশজুড়ে এখন চর্চা চলছে। এই প্রসঙ্গেই তিনি দাঁত ও জিভের বিষয়টি এনেছেন।

পরপর কয়েকটি মধ‌্যরাতের ‘রিল’ এবং সর্বোপরি এই ক্ষমার বার্তা আন্দোলনকারী ‘জেন জি’-র সঙ্গে মোদির দূরত্ব কতটা কমাতে পারল– তা ভবিষ‌্যৎই বলতে পারবে। কিন্তু ৭৫ বছর বয়সি প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগের প্রশংসা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও চলছে। ক্ষমা করার এই শেষ ভিডিওটিতে মোদি যন্তর মন্তরে এই ‘জেন জি’ কিশোরীটির মতো কিছু ‘পথভ্রষ্ট’ ও ‘দুষ্টু’ প্রকৃতির ছেলেমেয়ের উপস্থিতি নিয়ে কটাক্ষ করলেও, এটা স্বীকার করেছেন যে, ‘সমাজের ভিতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষের উপস্থিতি আমিও ভালো করে বুঝতে পারছি।’ একটি অল্পবয়সি মেয়ের মুখ থেকে অমন ভাষা শোনা যে তাঁর কাছে একটি ‘সাংস্কৃতিক ধাক্কা’, সে-কথাও স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এরপরই তিনি দাঁত ও জিভের উদাহরণ দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে পথে নামা ‘জেন জি’-কে বুকে টেনে নেওয়ার কথা বলেছেন। অনেকের দাবি, এটাকে মোদির একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলা যেতে পারে। কারণ, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা প্রদান ও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র ধরনা আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে যাওয়ার পরেও যে সরকার-বিরোধী একটা ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল, সরকার প্রতিহিংসামূলক আচরণ করছে বলে আন্দোলনকারীদের একাংশের মধ্যে সোচ্চার হওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল, তাতে পুরোপুরি জল ঢেলে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এই সর্বশেষ ভিডিও।

প্রধানমন্ত্রী নিজে জানিয়েছেন, ওই পড়ুয়া শুধু তাঁকে নয়, তাঁর প্রয়াত মাকেও অশালীন শব্দে বিদ্ধ করেছে। ‘এফআইআর’ হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভিডিও-বার্তায় মোদি ওই কিশোরীকে ক্ষমা করে দিয়ে অবশ‌্যই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা নিয়ে দেশজুড়ে এখন চর্চা চলছে।

গণতন্ত্রকে সজীব রাখতে মাঝে মাঝেই সার, জল দিতে হয়। সরকার-বিরোধী এই আন্দোলনগুলিই সার, জলের কাজ করে। বর্তমান সময়ে আমাদের দুর্ভাগ‌্য হল যে, দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলিকে সারা বছর মানুষের ন‌্যায‌্য দাবিগুলি নিয়ে আন্দোলনে পাওয়া যায় না। তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো একটি জ্বলন্ত সমস‌্যা নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে নেমে পড়তে হয় অল্পবয়সি পড়ুয়াদেরই। এবারের যন্তর মন্তরের আন্দোলন ছিল এমনই একটি আন্দোলন। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আন্দোলনের ক্ষেত্রে সরকারের একটি সুবিধার দিক থাকে। কারণ তখন আন্দোলনের একটা নেতা পাওয়া যায়। সেই নেতাকে নানা পন্থায় ‘ম‌্যানেজ’ করে আন্দোলন সহজে মোকাবিলা করা যায়। যন্তর মন্তর আন্দোলনে সেভাবে কোনও নেতা ছিলেন না। অনশনকারী সোনম ওয়াংচুকের ভূমিকা অনেকটা বিবেকের মতো ছিল। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাসকে সেই অর্থে ‘নেতা’ বলা যায় না। ‘জেন জি’-র আবেগ ও উচ্ছ্বাসের উপরই দাঁড়িয়েছিল আন্দোলনটির সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি। বাস্তবিকই এই আন্দোলনকারীদের উপর কারও কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সেক্ষেত্রে মোদির ভিডিও-বার্তার কৌশল ‘জেন জি’-কে নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকটা কার্যকরী বলে ধারণা বহু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরও।

ছবি এআই দ্বারা নির্মিত

‘নিট-ইউজি’-র মতো সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলির প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সরকার ইনফোসিসের চেয়ারম‌্যান নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছে এবং নতুন আইনে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দোষীদের সাজা দ্বিগুণ করেছে। কিন্তু প্রযুক্তি ও শাস্তির ভয় আদৌ প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা কতখানি ঠেকাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নফাঁসের নেপথ্যে কাজ করে হাজার হাজার কোটি টাকার কোচিং ব‌্যবসা। নিট তুলে দিয়ে ডাক্তারিতে ভর্তির ক্ষেত্রে ফের উচ্চ মাধ‌্যমিকের ফলাফলে ফিরে গেলে একমাত্র কোচিং সেন্টারগুলির উপর পড়ুয়াদের নির্ভরতা কমবে। বছর বছর প্রশ্নফাঁসের এই বিপত্তি থাকবে না। পড়ুয়াদের আত্মহত‌্যাও হয়তো দেখতে হবে না। শিক্ষার্থীরাও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হওয়ার কৌশল শেখার চেয়ে প্রকৃত লেখাপড়ায় মন দিতে পারবে, যা আখেরে দেশের প্রগতিতে কাজে লাগবে। প্রকৃত লেখাপড়াই মানুষের ‘ক্রিটিকাল থিঙ্কিং’-এর ক্ষমতা তৈরি করে। শিক্ষাব‌্যবস্থা যদি দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়, তাহলে পড়ুয়ারা সৃজনশীল হয় না। ‘ক্রিটিকাল থিঙ্কিং’-এর ক্ষমতাও গড়ে ওঠে না। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজন ‘ক্রিটিক‌াল থিঙ্কিং’। যন্তর মন্তরের আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষাব‌্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তনের দাবির উপাদানটি ছিল। সেটিকে অগ্রাহ‌্য করা ঠিক হবে না।

ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাসকে সেই অর্থে ‘নেতা’ বলা যায় না। ‘জেন জি’-র আবেগ ও উচ্ছ্বাসের উপরই দাঁড়িয়েছিল আন্দোলনটির সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি। বাস্তবিকই এই আন্দোলনকারীদের উপর কারও কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া, ২০২৬’ বলে যে রিপোর্টটি সম্প্রতি সংবাদমাধ‌্যমের প্রচারে এসেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে দেশের ১৫ থেকে ২৫ বছরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব ৪০ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৯ বছরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব ২০ শতাংশ। যন্তর মন্তর-সহ গোটা দেশে পথে নামা ‘জেন জি’-র হতাশার মূলে যে এই বেকারত্ব– তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা অর্বাচীনের কাজ হবে। মোদি এটিকেই সমাজের ক্ষোভ ও হতাশা বলে ব‌্যাখ‌্যা করতে চেয়েছেন। বস্তুত, যন্তর মন্তরের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিই ছিল বেকারত্বের এই ক্ষোভ ও হতাশা। এই হতাশা দূর করতে শিক্ষাব‌্যবস্থায় মৌলিক ও আমূল পরিবর্তনের জন‌্য এখন মোদি সরকারকেও কিছু দৃঢ় পদক্ষেপ করতে হবে। ‘দাঁত ও জিভ, দুটোই আমার’ শুধু এই কথা বললেই হবে না। সরকারের কাজের মধ্যে দিয়েও তা প্রমাণ করতে হবে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement