সঞ্জয় দত্ত, নোরা ফতেহি অভিনীত একটি গানকে ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে অশালীন বলে। কিন্তু সিনেমা বা অন্য শিল্পে এভাবে বলা যায় কি? হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে এমন অনেক সিনেমা রয়েছে, রয়েছে এমন অনেক গানের দৃশ্য, যেখানে খোলামেলা পোশাক বা যৌনতার ইঙ্গিত অকপটে দেওয়া। কই, সেসব সিনেমা বা গানকে ‘নিষিদ্ধ’ করা তো হয়নি!
সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা-র ‘অ্যানিমাল’ (২০২৩) যখন প্রকাশ পেল, তখন হিংসা ও পৌরুষের মাত্রাছাড়া প্রকাশ নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ উঠেছিল, ‘ডমিনেশন’ বা নিয়ন্ত্রণকামী মানসিকতা নিয়েও। আমির খান সে নিয়ে প্রতিবাদ করেন। ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’ আগুনের গোলার মতো। লম্বা সময়ের পরিসরে ভাবলে, এ ধরনের ‘কনটেন্ট’ আসলে ভালো ও শিল্পীত সিনেমার পরিপন্থী। সামাজিক মাধ্যমে আমির খানের মন্তব্যের সমর্থনে অনেকেই কথা বলেছিলেন। কিন্তু চমকে দেন সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা স্বয়ং। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি পালটা বলেন, আমির খানের সিনেমায় কি আধিপত্যকামী পৌরুষের প্রকাশ ঘটেনি? ‘খাম্বে জইসি খাড়ি হ্যায়/লড়কি হ্যায় ইয়া ছড়ি হ্যায়’ গানটি কি মেয়েদের শরীর নিয়ে ব্যঙ্গ করে না, মেয়েদের বস্তুসর্বস্ব ও শরীরময় করে তোলে না? আমির খান এই যুক্তির সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেননি, মেনে নেন এ কথার সারবত্তা ও ক্ষমাও যাচনা করেন।
তাহলে কে জিতলেন: সন্দীপ, না, আমির? কেউ নন, বিষয়টি হার-জিতের নয়, পরাভব আসলে ঘটেছে সেই যুক্তিটির, যা মেয়েদের মননশীল ও ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠার পক্ষে সওয়াল করে। ‘অ্যানিমাল’ নিয়ে অভিযোগের বিপরীতে আর-একটি অভিযোগ তুলে মূল সুরটিকে সাময়িকভাবে চেপে দেওয়া তো আর কাজের কথা নয়। অথচ ‘শালীন’ বা ‘অশালীন’ নিয়ে কথা বলতে গেলে দৃষ্টান্ত না দিলেও নয়।
বিষয়টি হার-জিতের নয়, পরাভব আসলে ঘটেছে সেই যুক্তিটির, যা মেয়েদের মননশীল ও ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠার পক্ষে সওয়াল করে।
সম্প্রতি সঞ্জয় দত্ত ও নোরা ফতেহি অভিনীত ‘সরকে চুনর তেরি সরকে’ গানটিকে ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে অশালীন অভিযোগে গেঁথে। এ গানে যৌন ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট, আর শিল্পীর বাক্স্বাধীনতার মধ্যেও কিছু ‘যুক্তিসংগত সীমারেখা’ থাকা উচিত– এমন যুক্তি দেখিয়ে লোকসভায় গানটিকে ‘নিষিদ্ধ’ করার পক্ষে কণ্ঠ তুলেছিলেন মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। এরপরে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এ ছবির পরিচালকের স্ত্রী বলেছেন, যৌন সঙ্গম দেখানো হয়েছে বা আভাস দেওয়া হয়েছে যেসব সিনেমায়, তা যখন ছাড়পত্র পায়, তাহলে একটি গানে কিছু যৌন ইঙ্গিতবাহী কথা থাকলে মহাভারত কেন অশুদ্ধ হবে?
অস্বীকার করার জো নেই, হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে এমন অনেক সিনেমা রয়েছে, রয়েছে এমন অনেক গানের দৃশ্য, যেখানে খোলামেলা পোশাক বা যৌনতার ইঙ্গিত অকপটে দেওয়া। কই, সেসব সিনেমা বা গানকে ‘নিষিদ্ধ’ করা তো হয়নি! কোন মানদণ্ড তাহলে লাগু হবে সিনেমা বা সিনেমার গানের দৃশ্যকে ‘নিষিদ্ধ’ করার সময়? ‘অশালীন’ (১৯৯৪) নাটকে ব্রাত্য বসু দেখিয়েছিলেন, অপশব্দ বা অপভাষা বা অপসংস্কৃতি বলে দেগে দেওয়ার আগে বিচার করা প্রয়োজন, ক্ষমতার কাঠামোয় তা অন্তর্ঘাত ঘটাতে পারছে কি না! নয়তো ‘অশালীন’ নির্বিষ শব্দ বলে প্রতিপন্ন হতে বাধ্য। যুক্তিটি প্রণিধানযোগ্য।
