ভারতের অন্য যে কোনও রাজ্যের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণ অনেক তীব্র। তারই ফলশ্রুতি, যে কোনও নির্বাচনের পর সন্ত্রাস ও মৃত্যুর ঘটনা। অসরকারি সংস্থা 'আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রোজেক্ট'-এর (এসিএলইডি) তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম দেখিয়েছে, গত ছয় বছরে ভারতের অন্য যে কোনও রাজোর তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন সংক্রান্ত সহিংসতা বেশি ঘটেছে।
পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। ৩০০টি হিংসার ঘটনা এবং ৫৮ জনের মৃত্যু হয়। এরপরই ছিল ২০২৪ সালের অন্ধ্রপ্রদেশ। যেখানে ৮৯টি ঘটনা এবং তিনজনের মৃত্যু ঘটে। সংসদীয় এবং স্থানীয় নির্বাচন মিলিয়ে ভারতে ভোট-সম্পর্কিত সমস্ত সহিংস ঘটনার ৩৫ শতাংশ (২,৫৯৩টির মধ্যে ৯০৪টি) এবং নির্বাচন-সম্পর্কিত সমস্ত প্রাণহানির ৫১ শতাংশ (৩২৯টির মধ্যে ১৬৮টি) শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ঘটেছে।
বিজয়ী বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-সহ শীর্ষ নেতৃত্ব শান্তি রক্ষার কড়া বার্তা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনও কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবুও হিংসা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
বলা বাহুলা, রাজ্যের পক্ষে এটা মোটেও শ্লাঘার বিষয় নয়। বাংলায় এবার বিধানসভা ভোটের দু'-দফায়, ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল কোনও প্রাণহানির ঘটনা না-ঘটায় স্বস্তি প্রকাশ করেছিল সাধারণ মানুষ। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আসতে চলেছে ভেবে আশা প্রকাশ করেছিল। অনেকেই। কিন্তু ভোট-পরবর্তী হিংসা ও প্রাণহানি ঠেকানো গেল না। ৪ মে ফলপ্রকাশের পর থেকে এখনও পর্যন্ত অন্তত জনের মৃত্যু হয়েছে। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত-সহায়ক চন্দ্রনাথ রখও। এছাড়াও নানা জায়গায় পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস ভাঙচুর-দখল, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মারধরের মতো অভিযোগ উঠে আসছে।
বিজয়ী বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-সহ শীর্ষ নেতৃত্ব শান্তি রক্ষার কড়া বার্তা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনও কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবুও হিংসা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। প্রথমত, এর দায় কোনও রাজনৈতিক দলই এড়াতে পারে না। নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্যন্ত যে-শূন্যস্থান থাকে, সে-সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলই জমি পুনরুদ্ধার বা দখলের চেষ্টা করে। তাই নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য আগাম ব্যবস্থা এবং নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর হাতে বলবৎ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, ভোটপূর্বের ঝামেলা ও অশান্তির বেশ প্রতিশোধ স্পৃহা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে থাকতেই পারে। তা ঠেকানোর জন্য পুলিশ-প্রশাসনেরও সতর্ক থাকা উচিত। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে গা-ছাড়া মনোভাব দেখা যায়। তার উপর সামাজিক মাধ্যমে নান্য ভিডিও ও উত্তেজক-উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
কিন্তু এই ধরনের ঘটনা সারা দেশ তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও রাজ্যের ভাবমূর্তি আরও তলানিতে নিয়ে যায়। তাই ভোট-পরবর্তী হিংসার এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির দ্রুত বদল হোক। আর কোনও পরিবার যেন কাছের মানুষ, পরিজন না-হারায়।
