নির্বাচনী আবহে ক্ষমতা ও শক্তির হুংকার বাড়বে। প্রচার হবে আরও দুর্বিনীত, অহংকারী ও দাপুটে। এই আত্মশ্লাঘার মধে্যই নিয়ত ধ্বংসের বীজ।
নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে আমরা কিছু দিন আগেও তেমনভাবে চিনতাম না। হঠাৎ তঁার খুব নামডাক হয়েছে। তঁাকে এই রাজ্য হাড়ে হাড়ে চিনতে শুরু করেছে। তঁার ব্যবহার কর্কশ এবং উদ্ধত। বিনয় এবং ব্যবহারিক মাধুর্য তঁার ধাতে নেই, এই বার্তা সংবাদপত্রগুলির পাতায় পাতায়। ব্যবহার এবং মুখের ভাষার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের রাজার ভাষার মিল অস্বীকার করার জো নেই। সেই একইরকম অহং, এবং ক্ষমতার জাহির। কোনও দিন জ্ঞানেশ কুমার যদি সত্যিই রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’-র মতো হুবহু এই বার্তা দেন যে, ‘মোর রাজ্যে কে দিতে পারে আজ্ঞা? আমি একা, আমি মহান, আমি রাজা...’– তাহলে তত দিনে অভ্যস্ত আমরা হয়তো অবাক বা হতবাক হব না।
রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’-র মুখের ভাষায় আমরা যেন হিটলারের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই: আমিই আইন এবং আমার ইচ্ছাই সুপ্রিম। রাজার পরিণতিও হিটলারের মতো। মানুষের ধমকানি, চমকানি, ক্ষমতার জাহির এবং অহংকার যখন সমস্ত হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এক অর্বাচীন বাড়াবাড়িতে পৌঁছয়, তখন প্রাচীন গ্রিকরা ক্ষমতার সেই প্রকাশকে ‘হিউব্রিস’ নামে চিহ্নিত ও সংজ্ঞায়িত করে সেই প্রাচীন কালে। মহাকবি হোমার ‘হিউব্রিস’-কেই করে তুলেছেন তার ‘ইলিয়ড’ মহাকাব্যের প্রধান বিষয়।
জ্ঞানেশ কুমার যদি সত্যিই রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’-র মতো হুবহু এই বার্তা দেন যে, ‘মোর রাজ্যে কে দিতে পারে আজ্ঞা? আমি একা, আমি মহান, আমি রাজা...’– তাহলে তত দিনে অভ্যস্ত আমরা হয়তো অবাক বা হতবাক হব না।
এই মহাকাব্যের প্রতিটি চরিত্র, অ্যাকিলেস থেকে অ্যাগামেমনন থেকে প্যারিস, প্রত্যেকেই প্রকাশ করছে বিপুল ও বিকৃত অহংকারের এক-এক রূপ। আগামেমনন প্রায়ামের কন্যা কাসান্দ্রাকে যে অহংকারের সঙ্গে নিজের রক্ষিতা করে রাখছে, তাতে সমস্ত ট্রয়বাসীকে সে অপমান করছে। এবং তার এই অহংকারই ডেকে আনে দৈবরোষ। এসকিলাসের এই বিশ্বাস তঁার সমস্ত লেখার মধ্যে প্রকাশিত: দ্য গডস্ আর অন দ্য সাইড অফ দ্য প্রুডেন্ট, নট দ্য অ্যারোগান্ট। তলস্তয় তঁার ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস উপন্যাসের নেপোলিয়নকে দেখিয়েছেন হিউব্রিস বা অর্বাচীন, বিকৃত অহংকারের শোচনীয় শিকার রূপে। তলস্তয়ের নেপোলিয়ন কোনও পূজনীয় দেশনেতা নন। নন কোনও শ্রদ্ধেয় বীরপুরুষ। তিনি ইতিহাসের চোখে হাস্যকর হয়ে ওঠেন, যখন বলেন, ‘আই অ্যাম দ্য গ্রেটেস্ট অ্যান্ড আই নো ইট।’ এখানেই থেমে থাকেন না তলস্তয়ের নেপোলিয়ন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘ডেসটিনি ইজ কলিং মি টু দ্য থ্রোন অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’।
এই হিউব্রিস তথা আত্মশ্লাঘা জানান দেয়, চুরমার ও |পতন অনিবার্য। যত এগিয়ে আসবে নির্বাচন, ততই ক্ষমতার উচ্চারণ, শক্তির হুংকার বাড়বে। রাজনীতির ভাষা হবে আরও কর্কশ। প্রচার হবে আরও দুর্বিনীত, শাসকের ব্যবহার আরও অহংকারী এবং দাপুটে। তার মধ্যে প্রাচীন গ্রিক নাট্যকার এসকিলাসের এই কথাটা যেন ভুলে না যাই : হিউব্রিস লিডস টু দি ডাউনফল অফ মেন! অহংকারের পতন নিশ্চিত। কেননা, দুর্বিনীত আত্মশ্লাঘা নিজের মধ্যে ধারণ করে ধ্বংসের বীজ।
